Header Ads

থিওডোর হার্জেল ও উসমানীয় সাম্রাজ্যঃ যেভাবে জায়নবাদীদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেন সুলতান আব্দুল হামীদ



মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক|

আমরা যদি গভীরভাবে ইতিহাস অধ‍্যায়ন করি, তাহলে দেখতে পাই যে ইহুদীরা ছিল একটি বিতাড়িত ও অত‍্যাচারীত সম্প্রদায়। ইহুদীদের চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের জন্য কোন জাতীর কাছেই তারা শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠতে পারে নি। রোমান বা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে ইহুদীরা ছিল চরম অত‍্যাচারীত। তারা যাযাবরের মতোই জীবন যাপন করে আসছে। বরং বলা ভালো, খৃষ্টানদের কাছ থেকে অত‍্যাচারীত হওয়া ইহুদীরা ইসলামী সাম্রাজ্যে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়।

মধ‍্যযুগে যখন খৃষ্টান দেশগুলিতে ইহুদীরা বর্বর অত‍্যাচারের স্বীকার হয় ঠিক তখন উসমানীয় সাম্রাজ্যে অন‍্যান‍্য জাতির মতো ইহুদীরাও সুখে শান্তিতে বসবাস করছিল। এসময় পশ্চিমাদের অত‍্যাচার থেকে বাঁচতে ইহুদীরা পালিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যে চলে আসতে থাকে এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যে তারা নিরাপদে সুখে শান্তিতে বসবাস করছিল।  প্রথম আলিয়া ( First Aliyah) এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যখন রাশিয়ার অত‍্যাচারে ইহুদীরা দলে দলে উসমানীয় ফিলিস্তিনে আসতে থাকে পশ্চিমাদের সমর্থন নিয়ে। আলিয়াহ এক্সোডাসই যে উসমানীয় সাম্রাজ্যে আসা প্রথম ইহুদী স্রোত ছিল তা কিন্তু  নয়!  এর পূর্বেও বহু ইহুদী পালিয়ে আসে। যেমন ১৮৩০ সালে আশকেনাজি ইহুদীরা ইউরোপ থেকে উসমানীয় সাম্রাজ্যে আসতে থাকে। তখন ইহুদীরা ছিল ছন্নছাড়া।

ঠিক এমন সময় জন্মগ্রহণ করেন জায়নবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জেল। থিওডোর হার্জেল ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে হাঙ্গেরি সম্রাজ‍্যের বোদাপেস্টে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইহুদী জ‍্যাকোব হার্জেল ও জিনেট হার্জেলের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন। তাঁর নানাজী ছিলেন একজন ইহুদী রব্বানী (রব্বী)। শৈশব থেকেই হার্জেলের উপর তাঁর মায়ের প্রভাব ছিল বেশি। এজন্যই শৈশব থেকেই তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা করতেন।

পরবর্তী কালে তিনি স্বপরিবারে অস্ট্রিয়াতে আসেন। এসময় তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ও আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি সেখান থেকে পাস করার পর সাংবাদিক জীবন শুরু করেন ও ভিয়েনা থেকে প্রকাশিত Neui Frei Presse পত্রিকার সাংবাদিকতা শুরু করেন। এসময় ১৮৯১ সালে তিনি ফ্রান্সে আসার পর সেখানে ইহুদী কম‍্যান্ডার ড্রেফুসের নির্মম পরিণতি দেখে তিনি ব‍্যথিত হন। তখন থেকে একটি ইহুদী রাষ্ট্র তৈরির চিন্তা তাঁর মাথায় চেপে বসে। তাঁর মতে

"Jews as a nation had the abilities and opportunities to establish their homeland"
(The Jewish State, Theodore Herzl, pg. 24) 

 তিনি একটি ইহুদী রাষ্ট্র স্থাপনের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন নেতাদের সাথে মেশেন কিন্তু তারা কেও তাঁর আহ্বানে যথাযথ সাড়া দেয় নি। এরপর তিনি ১৮৯৫ সালের জুন মাসে ইহুদী রূথচাইল্ড ও অপর এক ইহুদীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁর আশা ছিল হয়ত তাঁরা তাঁকে সহায়তা করবেন।

কিন্তু রূথচাইল্ডও তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন না।  তিনি রুথচাইল্ডকে সকল জায়নবাদী কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেবার অফার করার পরও যখন রুথচাইল্ড তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন না , তিনি হতাশ হলেন। তিনি দুঃখিত হয়ে মনে করেন যে, রুথচাইল্ড তাঁর কথা বুঝতে পারেন নি।  তবে তিনি ইহুদী রাষ্ট্র স্থাপনের আশা ত‍্যাগ করেন নাই। এসময় ইউরোপের দরিদ্র ইহুদীদের সমর্থন নিয়ে তিনি জায়নবাদী কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি মনে করতেন এই দরিদ্ররাই একদিন একটি ইহুদী রাষ্ট্র তৈরি করবে।‌

এদিকে ইউরোপে যখন সমর্থন ও দেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ব‍্যর্থ হল তখন তিনি নজর দিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের দিকে। তিনি উসমানীয় ফিলিস্তিনকে ইহুদী রাষ্ট্র বানানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। আর  এসময় এই অঞ্চলটি জায়নবাদী আন্দোলনের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছিল।‌ ইতিমধ‍্যে প্রথম আলিয়াহ ও পূর্ববর্তী ইহুদী অভিবাসনের পর এই অঞ্চলে বহু ইহুদীর বসবাস শুরু হয়েছিল । বিশেষ করে প্রথম আলিয়ার পর ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৮৮২ সালের ২৮ এপ্রিল উসমানী সাম্রাজ্য শরণার্থী ইহুদীদের জন্য ফিলিস্তিনে প্রবেশ নিষেধ করে দেয় ও অন‍্যান‍্য ওলায়াতে আবাসনের অনুমতি দেয়। এদিকে হার্জেলের পূর্বেই ১৮৮২ সাল থেকেই রাশিয়ার হোভেভেই জিওন আন্দোলন শুরু হয়। ১৯০০ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্য ফিলিস্তিনে রাশিয়ার শরণার্থী ইহুদী প্রবেশ নিষিদ্ধ করে।

এসময় উসমানীয় সাম্রাজ্য নানাবিধ সমস্যা ও যুদ্ধে ভুগছিল যা আমি আমার পূর্ববর্তী লেখা বলকান সমস্যা নিয়ে আর্টিকেলে বর্ণনা করেছিলাম। যাইহোক, হার্জেল দেখলেন এসময় উসমানীয়দের সাথে যোগাযোগ না করলে ফিলিস্তীনে রাষ্ট্র স্থাপন করা সম্ভব নয়।

 তাই তিনি ১৮৯৬ সালে সাংবাদিকের ছদ্মবেশে জায়নবাদী মিশন নিয়ে ইস্তাম্বুলে আসেন। এসময় তিনি উসমানীয় সাম্রাজ্যের অস্ট্রো হাঙ্গেরিয়ান দূতাবাসের কর্মকর্তা ফিলিপ মাইকেলের সাথে যোগাযোগ করেন এবং দুজনেই ' বড় অঙ্কের অর্থ ও ইহুদী সমর্থনের' বিনিময়ে  ফিলিস্তিন কেনার প্রস্তাব নিয়ে ইস্তাম্বুলের আব্দুল হামীদের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথমধ‍্যে ট্রেনে তিনি বেলগ্রেডের উসমানীয় দূত তৌফিক পাশা সহ কারাতোদোরি পাশা ও জিয়া পাশা নামে উসমানীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে পরিচিত হন। তিনি তাঁর প্রস্তাবের বিষয়ে তাঁদের জানালে উসমানীয় কর্মকর্তাগণ ফিলিস্তিনের বিষয়টি নাকচ করে দেন।

এরপর যখন হার্জেল মাইকেলকে দিয়ে সুলতান আব্দুল হামীদের কাছে ফিলিস্তীন প্রস্তাব রাখলেন, তখন আব্দুল হামীদ গর্জে ওঠেন। তিনি তখন তাঁর ঐতিহাসিক হুংকার দেন যেটি হার্জেল নিজেই তাঁর The Complete Diaries এ উদ্ধৃতি করেছেন। আব্দুল হামীদ বলেনঃ

"If Mr Herzl is as much your friend as you are mine, then advise him not to take another step in this matter. I cannot sell even a foot of land, for it does not belong to me, but to my people. My people have won this empire by fighting for it with their blood and have fertilized it with their blood. We will again cover it with our blood before we allow it to be wrested away from us. The men of two of my regiments from Syria and Palestine let themselves be killed one by one at Plevna. Not one of them yielded; they all gave their lives on that battlefield. The Turkish Empire
belongs not to me, but to the Turkish people. I cannot give away any part of it. Let the Jews save their billions. When my Empire is partitioned, they may get Palestine for nothing. But only our corpse will be divided. I will not agree to vivisection."

তিনি হার্জেলের সাথে দেখাই করলেন না। অতঃপর তিনি মাইকেলকে বলেন হার্জেল যদি পারে ইউরোপীয় মিডিয়াগুলোর উসমানী বিদ্বেষী মনোভাব কিছু কমিয়ে আনার চেষ্টা করুক। কারণ তখন তিনি ইউরোপীয় মিডিয়ার সাথে গভীর ভাবে যুক্ত ছিলেন ও ইউরোপীয় মিডিয়া উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছিল। এর  বিনিময়ে মাইকেলের প্রচেষ্টায় উসমানীয় সাম্রাজ্য তাঁকে মেজিদি মেডেল দেয়।

কিন্তু হার্জেল হাল ছাড়েননি। তিনি পরবর্তীতে পশ্চিমাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন ও জায়নবাদী আন্দোলন আরো মজবুত করেন। ইতিমধ্যে ১৮৯৭ সালে তিনি প্রথম জায়নবাদী সম্মেলনের আহ্বান করেন ও জায়নবাদী সংস্থা The Zionist Organisation ( WZO) প্রতিষ্ঠা পায়। ১৮৯৯ সালে এই সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনে ঠিক করা হয় আবারো বড় অর্থের বিনিময়ে আব্দুল হামীদ রহঃ এঁর কাছে ফিলিস্তিনের দাবি করা হবে।   পরে সেইমত ১৯০১ সালে তিনি আবার উসমানীয় খলিফা আব্দুল হামীদের সাথে দেখা করতে চাইলেন। এসময় তুরস্কের রব্বী মোশে তাঁর সাথে ছিলেন। কিন্তু খলিফার সাথে উসমানীয় সাম্রাজ্যে বসবাসরত ইহুদীদের নিয়ে আলোচনা করলেও ফিলিস্তিনের বিষয়টি তিনি উত্থাপন করতে পারলেন না। কারণ ইতিপূর্বে তাঁকে এবিষয়ে মানা করা হয়েছিল। কিন্তু উসমানী খলিফা হার্জেলকে ব‍্যবহার করে ফ্রান্সের সাথে সম্পর্ক মজবুত করেন। এজন্য ঐতিহাসিক মুস্তফা আরমাগান তাঁকে A Smart Game Player হিসেবে বর্ণনা করেন।

এদিকে ফিলিস্তীনকে ইহুদী রাষ্ট্র বানানোর স্বপ্ন যখন ভঙ্গ হল তখন অন্ততঃ উসমানীয়রা যাতে ফিলিস্তিনে ইহুদীদের ঢুকতে দেয় ও ইহুদীদের উপর লাগানো নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এজন্য চিন্তা ভাবনা করতে লাগল। তখন উসমানীয় পার্লামেন্টের ইহুদী সদস্য বাহোর আফেন্দী তাদেরকে সহায়তা করেন ও অর্থের বিনিময়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সাথে এইধরনের কোনো চুক্তি করার পরামর্শ দেন। সেইমতো ১৯০৭ সালের অক্টোবর মাসে জায়নবাদী নেতা উল্ফশন উসমানীয় সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব দেন। যাতে বলা হয় উসমানীয়রা ৫০০০০ ইহুদীকে ফিলিস্তিনে বসবাসের অনুমতি দেবে। ঐ ইহুদীরা হবে উসমানীয়দের ভক্ত ও উসমানীয় আইনকানুন মেনে চলবে। এর বিনিময়ে ইহুদীরা উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ২ মিলিয়ন অর্থ দেবে।  কিন্তু উসমানীয় সরকার এই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন ও ইহুদীদের ফিলিস্তিনে আরোপ করা ইহুদীদের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলতে অস্বীকার করেন ও ইহুদীদের সেখানে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন নি। কিন্তু বিরুদ্ধে উসমানীয় ষরা ইস্তাম্বুলে একটি ইহুদী ব‍্যাঙ্ক খোলার অনুমতি দেন। তাছাড়া এসময় একটা বড় সংখ্যক ইহুদী ইস্তাম্বুল ও তার আশেপাশে বসবাস করত।

এভাবেই উসমানীয় সাম্রাজ্যে ইহুদী জায়নবাদীদের ফিলিস্তিনে বাস করা করার ও ইহুদী রাষ্ট্রের স্বপ্ন ব‍্যর্থ হয়  উসমানীয়রা ফিলিস্তিনের বিষয়ে কখনো আপোষ করেন নি।  ফলে জায়নবাদীরা উসমানীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে ও উসমানীয়দের শত্রুদের সাথে যোগ দিয়ে উসমানীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। ফলশ্রুতিতে উসমানীয়দের শত্রুদের মুকুটে আরো একটি পালক যুক্ত হয় ও উসমানীয় বিরোধী ষড়যন্ত্র আরো তীব্র হয় । ফলশ্রুতিতে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

সূত্রঃ

১)  دور اليهود في إسقاط الدولة العثمانية لـ هيلة بنت سعد بن محمد السلمي

২) The Ottoman Policy towards Jewish Immigrantion and Settlement in Palestine by Büşra Barın

৩) Ottoman Policy and Restrictions on Jewish Settlement in Palestine by Neville J Mandel

৪) Restoring Jews to their Homeland by Joseph A Adler

৫) The Complete Diaries by T. Herzl.

No comments

Theme images by PLAINVIEW. Powered by Blogger.