ইজরায়েল ফিলিস্তীন সমস্যার প্রেক্ষাপট

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি তে যত সমস্যার উদ্ভব ঘটেছে তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্যেখযোগ্য সমস্যা হল 'ইসরায়েল- ফিলিস্তীন সংকট'। এই অন্চলকে কেন্দ্র করে বহু প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন গোত্র ও জাতির মধ্যে বিবাদ ও যুদ্ধ - বিগ্রহ সংঘটিত হয়েছিল যা আজও চলমান।
কেনান ভূমিঃ

আধুনিক ফিলিস্তীন বলতে লোহীত সাগর, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া ও ইজরায়েল বেষ্টিত অন্চলকে বোঝায়। প্রাচীনকালে ফিলিস্তীন 'কানানের ভূমি' (The Land of Canaan) নামে পরিচিত ছিল। ফিলিস্তীন, ইসরায়েল, জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়া নিয়ে এই অন্চল গঠিত ছিল। নূহ আঃ এঁর পুত্র কানানের নাম অনুসারে এই নামকরন করা হয়। এই অন্চলটি 'প্রতিজ্ঞ ভূমি ' হিসাবে ইসরাঈলীদের কাছে ও আল আকসার অবস্থান এবং মেরাজ শরীফের জন্য মুসলিমদের কাছে 'পবিত্র ভূমী' (The Holy Land) বা আল আরযুল মুকাদ্দাসা নামে পরিচিত। এই অন্চলটিকে ইসরায়েলরা 'প্রতিজ্ঞ ভূমি' হিসাবে চিনে থাকে। কারণ এই অন্চলটিকে ঈশ্বর হযরত ইব্রাহীম আঃ (Abraham) ও তাঁর বংশধরকে দান করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। বাইবেলের 'The Book of Genesis' গ্রন্থে ঈশ্বর ইব্রাহীম আঃ কে উদ্যেশ্য করে বলেন, "And I will give into thee and thy seed after thee the land where thou art a stranger, all the land of Canaan for an everlasting possession and I will be their God' (17:8) ইহুদী বা ঈসরায়েল জাতী হযরত ইব্রাহীম আঃ এঁর পুত্র হযরত ইসহাক আঃ (Issac) আঃ এঁর বংশধর তাই তারা একে প্রতিজ্ঞ ভূমি হিসাবে দাবী করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। যদিও আরব রাও‌ হযরত ইব্রাহীম আঃ এঁর পুত্র ইসমাঈল আঃ এঁর বংশধর। আমালেকা জাতী ও বনী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহর অভিশাপঃ প্রাচীনকালে এই কানানের ভূমি বা পবিত্র ভূমিটি 'আমালেকা' (Amalek) নামক এক দূর্ধর্ষ জাতীর অধীনে ছিল। কুরআনে তারা 'কওমুন জাব্বারুন'(শক্তিশালী জাতী' নামে পরিচিত। হজরত মূসা আঃ এঁর যুগে আল্লাহপাক তাঁকে আদেশ দিলেন বনী ইসরায়েল কে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা যেন যুদ্ধ করেন। কিন্তু বনী ইসরায়েলের ধৃষ্টতা ও যুদ্ধ হতে বিরত থাকার কারণে এই ভূমি তাদের জন্য চল্লিশ বৎসরের জন্য নিষিদ্ধ হয়। চল্লিশ বৎসর পর হযরত ইউশা' বিন নূন আঃ (Jousha) ও কালিব (Caleb) এঁর প্রচেষ্টায় এই ভূমি মুক্ত করা হয় । বনী ইসরায়েল তথা ইহুদীদের ধৃষ্টতার কারণে আল্লাহপাকের অভিশাপের কারণে তারা কখনো তারা ঐ পবিত্র ভূমিতে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে নি। তারা কখনো রোমান , কখনো অন্যান্য জাতি কতৃক বিতাড়িত হয়ে যাযাবরের মতো জীবন যাপন করতে থাকে। এভাবে প্রায় অনেক বছর কেটে যায়।  

যায়নবাদের পিতা ও তার স্বপ্নঃ 

এরপর উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অস্ট্রিয়ার ইহুদী থিওডর হার্জেল সর্বপ্রথম একটি স্বাধীন ইহুদী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখান। তিনি তাঁর গ্রন্থ 'The Jewish State' এ তাঁর পরিকল্পনার কথা বলেন। এজন্য তাঁকে যায়নবাদের পিতা বলা হয়। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য তিনি ইহুদী কংগ্রেস অনুষ্ঠান করেন এবং সেখান থেকে তিনি বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেন। ব্রিটিশ শাসক বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তারা তাদের হারানো ভূমি 'ফিলিস্তীন' কেই চয়ন করে। এদিকে আরবে প্রভাব বিস্তারের লক্ষে ব্রিটিশরা ইহুদীদের আবেদনকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে থাকে। 

 আরবদের সাথে প্রতারণা ও বেলফোরের ঘোষণাঃ 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমাদের ওসমানি সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষাবলম্বন করে। ফলে ওসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার চক্রান্ত শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯১৫-১৬ সালে মিশরের ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার হেনরী ম্যাকমাহন , পবিত্র হেজাজের ওসমানী গভর্ণর হুসাইন আলীর সাথে যোগাযোগ করেন এবং হাশেমীদের অধিনে একটি স্বাধীন আরবদেশ গড়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে ওসমানী খিলাফতের বিরুদ্ধে উসকে দেন। ফলে ওসমানী সাম্রাজ্যের পতন অবশ্যাম্ভবী হয়ে গেল। কিন্তু ব্রিটেন আরবদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে অবজ্ঞা করল। তারা ফ্রান্সের সাথে গোপনে আরবকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করতে 'Sykes-Pikot Agreement ' করেছিল। গোপনে তারা ইহুদী যায়নবাদী মিলিশিয়াকে সহায়তা করছিল। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ বিদেশমন্ত্রী লর্ড আর্থার বালফোর আরবদের স্বপ্ন ভঙ্গ করে ফিলিস্তীনে ইহুদীদের একটি আবাসভূমি প্রতিশ্রুতি দেন যা 'The Balfour Declaration' নামে পরিচিত। এতে বলা হয়ঃ "His Majesty's Government view with favour the establishment in Palestine of a national home for the Jewish people, and will use their best endeavours to facilitate the achievement of the object, it being clearly understood that nothing shall be done which may prejudice the evil and religious rights of the existing non-Jewish communities in Palestine or the rights and political status enjoyed by Jews in any other country." এরপর ফ্রান্স ও ব্রিটেন 'League of Nation' এর দোহাই দিয়ে ওসমানী সাম্রাজ্যের আরবকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল। ফ্রান্স সিরিয়া ও লেবাননে আধিপত্য বিস্তার করল আর ব্রিটেন ইরাকে, জর্ডন ও ফিলিস্তীনের উপর প্রভাব বিস্তার করল। ১৯২১ সালে ব্রিটেন তার অধিনস্ত আরবকে দুই ভাগে বিভক্ত করল। জর্ডান নদীর পূর্বপ্রান্তকে 'ট্রান্স জর্ডান আমিরাত' ঘোষণা করা হল। এর শাসনভার ফয়সলের ভাই আব্দুল্লাহর হাতে অর্পিত হল। উক্ত নদীর পশ্চীম প্রান্তকে ফিলিস্তীন নাম দেওয়া হল। এরপর ব্রিটেনের সহায়তায় দলে দলে ইহুদীরা ফিলিস্তীনে আসতে লাগল এবং সেখানে পতিত জমী ক্রয় করে বাসস্থান নির্মান করতে লাগল। এতে আরবরা শঙ্কিত হয়ে উঠল। তারা ব্রিটিশ আধিপত্য অস্বীকার করল। এরপর ফিস্তিনে ইহুদী ও আরবের মধ্যে খন্ড খন্ড দাংগা শুরু হল। ১৯২৯ সালের ১৫ আগস্টে Betar Jewish Youth Movement নামক একটি বিদ্রোহী দল কুদসে সর্বপ্রথম ইসরায়েলী পতাকা উড্ডীন করে। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে আরবরা ইহুদীদের আক্রমন করে। একসপ্তাহ দাংগার ফলস্বরূপ ১৩৩ জন ইহুদী ও ১১৫ জন আরব নিহত ও আহত হয়।  

আরব আন্দোলন ঃ 

১৯৩৩ সালে হিটলার সিংহাসনে আসীন হলে ইউরোপীয় ইহুদীরা ফিলিস্তীনে পালিয়ে আসে ও বসতি গড়ে। ফলে আরবরা বিদ্রোহ করে যা আরব আন্দোলনের (Arab Revolt, 1936-1939)সূচনা করে। কিন্তু জিওনিস্ট মিলিশিয়া ও তৎকালীন আরবের সিংহাসনাসীন মুনাফিকদের সহায়তায় ব্রিটেন এই আন্দোলন দমন করে। এই আন্দোনে ভীত হয়ে ব্রিটেন একটি White Paper স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইহুদী বসতী স্থাপনের সীমা নিদ্ধারিত করে দেয়। ইহুদীরা একে প্রতারণা হিসাবে চিহ্নিত করে। 

জাতিসংঘের পার্টিশন প্ল্যানঃ 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরব ও যায়নবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে উঠল। ব্রিটেন ফিলিস্তীনের উপর তাদের ম্যান্ডেট শেষ করার সিদ্ধান্ত নিল এবং রাষ্ট্রসংঘের কাছে ফিলিস্তীনের ভবিষ্যত নিদ্ধারণের আর্জি জানাল। ব্রিটেনের ধারণা ছিল রাষ্ট্রসংঘ এ বিষয়ে অক্ষম হবে ও ফিলিস্তীনকে তাদের কাছে 'UN Trusteeship' হিসাবে প্রদান করা হবে। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘ একটি প্রতিনিধি দল পাঠাল তদন্তের জন্য এবং ফিলিস্তীনকে দুইটি ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নিল। ১৯৪৬ সালের শেষের দিকে ফিলিস্তীনে মোট ১,২৬৯,০০০ আরব ও ৬০৮০০০ জন ইহুদী বসবাস করত। এসময় ইহদীরা ফিলিস্তীনের মোট জমির ৭% ক্রয় করে বসতী স্থাপন করেছিল। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসের ২৯ তারিখে রাষ্ট্রসংঘের General Assembly ফিলিস্তীনকে দুই ভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় । যার একটি অংশ হবে আরবদের অপরটি হবে ইহুদীদের। রাষ্ট্রসংঘের Partition Plan অনুযায়ী ইহুদীদের দেওয়া হল পুরো ফিলিস্তীনের ৫৬ % আর আরবদের দেওয়া হল ৪৩% । জেরুজালেম ও বায়তুল লাহম (Bethlehem) কে‌ International Zone হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হল। এই বিভাজনকে ইহুদীরা মেনে নিল এবং তারা চাইছিল আরো কিছু অংশ। কিন্তু আরবদের পক্ষে এই ন্যাক্করজনক বিভাজন মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তারা একে একটি প্রতারণা হিসাবে চিহ্নিত করে এবং ইসরায়েল কে তারা একটি কলোনি ব্যতীত অন্যকিছু ভাবতে রাজি ছিল না। 

ইসরায়েল রাষ্ট্রঃ

১৯৪৮ সালের ১৫ মে , ইসরায়েল তাদের ভূমি হতে আরবদের বিতাড়িত করল ও নিজেদের ভূমিকে 'The State of Israel' হিসাবে দাবী করল। কিন্তু প্রতিবেশী আরবদেশ সমূহ (মিশর, সিরিয়া , জর্ডান ও ইরাক) তা মেনে নিল না এবং ফিলিস্তীনকে যায়নবাদীদের থেকে 'রক্ষা' করতে যুদ্ধ শুরু করল। প্রথমদিকে আরবরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়। কিন্তু চেকোশ্লাভাকিয়ার হস্তক্ষেপ সবকিছুই ওলট পালট করে দেয়। ফলস্বরূপ ১৯৪৯ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে এ যুদ্ধ শেষ হয়। কিন্তু এবার ফিলিস্তীন তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেল। মোট ভূমির ৭৭ শতাংশ ইসরায়েলের অধীনে গেল, জর্ডান পূর্ব ফিলিস্তীনকে ও মিশর গাজা‌ সহ উপকূলীয় অন্চলকে দখল করল। এভাবেই রাষ্ট্রসংঘের পরিকল্পিত 'ফিলিস্তীন রাষ্ট্রের' আর বাস্তবায়ন হওয়া হল না। 

১৯৬৭ এর যুদ্ধঃ 

১৯৪৯ এর চুক্তির সত্বেও ফিলিস্তীন ও ইসরায়েলের মধ্যে বিবাদ চলতে থাকে।১৯৫৬ সালে সুয়েজ খালকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের , ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সাথে জোট বেঁধে মিশর আক্রমণ করে ও গাজা এবং সিনাই দখল করে। কিন্তু রাশিয়া ও আমেরিকার চাপে তা হতে বিরত হয়। এই সময় উক্ত অন্চলটিতে একটি ঠান্ডা যুদ্ধ বিরাজ করছিল যেহেতু রাশিয়া ও আমেরিকা বিশ্বে শক্তি বিস্তারের স্বপ্নে বিভোর ছিল। ১৯৬৭ সালে সোভিয়েত রাশিয়া সিরিয়াকে ভুল তথ্য দেয় যে ইসরায়েল সিরিয়া আক্রমণের জন্য সিরিয়া সীমান্তে সেনা সমাবেশ ঘটাচ্ছে । কিন্তু আসলে তা ছিল একটি মিথ্যা তথ্য। সিরিয়া এই তথ্যে প্রতারিত হয় কারণ ঐবছর সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল ও ইসরায়েলে সিরিয়াকে হুমকি দিয়েছিল যে, সিরিয়া যদি ফিলিস্তীনী মিলিশিয়ার আক্রমন না ঠেকাতে পারে তাহলে সিরিয়া সরকারের পতন অনিবার্য হবে। ফলে সিরিয়া মিশরকে সাহায্যের আবেদন জানায়। সেইমত মিশরীয় সেনা ১৯৬৭ সালে সিনাইতে প্রবেশ করে এবং মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দুন নাসের রাষ্ট্র সংঘকে উক্ত অন্চল হতে তাদের অব্জার্ভার দলকে হঠে যাবার আদেশ দেন। তারপর মিশর শাম আল শেখ ও দক্ষিন সিনাই অন্চল দখল করে । ফলে ইসরায়েল ভীত হয়ে মিশর ও সিরিয়ায় আক্রমণ চালায়। দীর্ঘ ছয় দিন যুদ্ধের পর ইসরায়েল পাশ্চাত্যের মদদে মিশরের নিকট হতে সিনাই, জর্ডানের নিকট হতে ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক আর সিরিয়া র নিকট হতে গোলান হাইট দখল করে।  

UN কাউন্সিল রেজুলেশন ২৪২ঃ

১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর রাষ্ট্রসংঘ রেজুলেশন ২৪২ এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সদ্য দখলকৃত অন্চল হতে সরে যাবার আদেশ দেয় যাতে উক্ত দেশসমূহে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ফরাসী ও ইংরাজী ভাষা রাষ্ট্রসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হওয়ায় একটি‌ সমস্যা হয়। ফ্রেন্চ ভাষার রেজুলেশনে বলা হয় Israel should withdraw from 'the territories' কিন্তু ইংরাজী তে 'the' শব্দটা নেই। তাই আমেরিকা ও ইসরায়েলে ইংরাজী ভার্সনটা গ্রহন করে ও কিছু অন্চল হতে সেনা প্রত্যাহারের কথা বলে। কিন্তু ফিলিস্তীনিরা এই রেজুলেশন মানতে নারাজ হয় কারন তা ফিলিস্তীনের রেকগনিশন দেয় নি। 

ফিলিস্তীনি মুক্তি সংস্থা( Palestine Liberation Organization):

ফিলিস্তীনের জাতীয়তাবাদকে অনুপ্রেরণা দিতে আরব লীগ ১৯৬৪ সালে ফিলিস্তীনি মুক্তি সংস্থা গঠন করে। এই সংস্থা একই সাথে সামরিক ও রাজনৈতিক ছিল। ফিলিস্তীনের স্বাধীনতা সংগ্রামী আবু আম্মার ইয়াসির আরাফাত ১৯৬৪ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত PLO এর চেয়ারম্যান ছিলেন। একই সাথে তিনি ফাতাহের চেয়ারম্যান ছিলেন। ফিলিস্তিনীরা PLO কে সরকার হিসাবে গণ্য করতে থাকে। কিন্তু ১৯৯৩ সালে ওসলো চুক্তি (Oslo Accords) ও ১৯৯৪ সালে Palestinian Authority (PA) গঠনের পর PLO গুরুত্ব হারাতে থাকে। ১৯৬০ সালে PLO এর বেস ছিল জর্ডানে। কিন্তু ১৯৭০-৭১ এ জর্ডানের সাথে যুদ্ধ হলে PLO কে জর্ডান হতে লেবাননে স্থানান্তর করা হয় । ১৯৮২ সালে জর্ডানে ইসরায়েলী দখলদারের ফলে PLO কে সেখান থেকে বিতাড়িত করা হলে তা তিউনিসিয়াতে স্থাপন করা হয়। 
১৯৭৩ এর যুদ্ধ ও মিশরের ভূমিকাঃ 

১৯৭১ সালে মিশরীয় রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত রাষ্ট্রসংঘে সিনাই ফেরৎ পাবার বিনিময়ে ইসরায়েলের সাথে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু আমেরিকা ও ইসরায়েল তা মানে নি। ফলে ১৯৭৩ সালে ইহুদীদের পবিত্র ইওম কপ্পুরের দিন সিরিয়া ও মিশর গোলান হাইট ও সিনাই আক্রমন করে ও কিছু বড় বিজয় পায়। কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপে তা বানচাল হয়ে যায়। যুদ্ধের পর ১৯৭৭ সালে আনোয়ার সাদাত ইসরায়েলে গমন করেন ও‌ নেসেটে একটি বক্তৃতা দেন। ফলে ১৯৭৮ সালে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টার আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেজিনকে মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে আমন্ত্রন জানান। সেখানে দুইটি এগ্রিমেন্ট সাক্ষরিত হয়। এক, ইসরায়েলে ও মিশরের মধ্যে শান্তি স্থাপন যার ফলে ১৯৭৯ সালে Israel Egypt Peace Treaty সাক্ষরিত হয় । দুই, ফিলিস্তীনী সমস্যা। কিন্তু আরব বিশ্ব এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে কারণ ইসরায়েল দখলকৃত স্থান হতে পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেয় নি।

প্রথম ইন্তিফাদাঃ

১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ফিলিস্তীনী জনতা ইসরায়েলের অগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আকারে বিদ্রোহ শুরু করে ও ইসরায়েলী পণ্য বয়কট করে। ইসরায়েলী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইতঝাক রবীন বিদ্রোহকারীদের হাড় ভেঙে দেবার আদেশ দেন। ফলে ১৯৯৭ সাল হতে ১৯৯১ সালে ইসরায়েলী বাহিনী একহাজারের বেশী ফিলিস্তীনী কে নির্মমভাবে হত্যা করে ও ফিলিস্তীনী নেতাদের বন্দী করে ফলে ইন্তফাদা বন্ধ হয়ে যায়। এসময় ফিলিস্তীনী PLO ও অন্যান্য সংস্থা যেমন হামাস ও ইসলামিক জিহাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ফলে ইন্তিফাদা ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হয়। ১৯৮৮ সালে Palestinian National Council স্বাধীন ফিলিস্তীনের দাবী করে । কিন্তু ইসরায়েলে তা অস্বীকার করে।

সন্ধি প্রক্রিয়া (The Negotiation Process):

১৯৯১ সালে গাল্ফ যুদ্ধের পর PLO একাকি হয়ে পড়তে থাকে। সৌদী আরব ও কুয়েত PLO কে সহায়তা বন্ধ করে দেয়। আমেরিকা এসময় মধ্যপ্রাচ্যে আরব ইসরায়েল দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে চাইল। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশের সরকার ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি শামিরকে আরব ও ইসরায়েল মধ্যে আপসে আসার কথা বলেন। শামির কয়েকটি শর্তে তা মেনে নেয়। 
শর্তগুলি হলঃ 
 ১) PLO কে আলোচনা সভায় রাখা যাবে না। 

 ২) ফিলিস্তিনীরা তাদের স্বাধিনতার কথা উল্যেখ করতে পারবে না। সেই অনুসারে ওয়াশিংটনে একটি নেগোশিয়েশন সভা অনিষ্ঠিত হয় যাতে PLO হীন PLO সমর্থিত প্রতিনিধি যোগদান করে। কিন্তু এই সভা তেমন ফলদায়ক হল না। উপরন্তু ফিলিস্তীনে হামাস ও ইসলামী জিহাদের মতো ইসলামী দলের প্রভাব বৃদ্ধি পেল।

ওসলো চুক্তিঃ

ফিলিস্তীনে ইসলামী অভ্যুত্থানে ভীত হয়ে আমেরিকা ইসরায়েল কে PLO এর সাথে সন্ধি করার পরামর্শ দেয়। ফলে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও PLO এর মধ্যে ওসলো চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এতে ইসরায়েল গাজা ও জেরিকো থেকে সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়। ফলে ১৯৯৪ সালে PLO ইসরায়েলমুক্ত অন্চল শাসনের জন্য Palestinian Authority স্থাপন করে। ১৯৯৬ সালে‌ Palestinian Legislative Council এর মাধ্যমে ভোটের ফলে ইয়াসির আরাফাত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

আল কুদস ইন্তিফাদাঃ

ওসলো চুক্তির সাথে কিছু সমস্যা হওয়ায় ফিলিস্তিনীদের উপর ইসরায়েল দৈনিক অত্যাচার করতে থাকে। ফলে তা কুদস ইন্তিফাদা ঘটায় ২০০০ সালে। ঐ বছরের ২৮ সেপ্টেম্বরে লিকুদ পার্টির রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী এরিয়েল শ্যারন এক হাজার ইসরায়েল সেনা নিয়ে কুদসে আসেন। এর ফলে ফিলিস্তীনি জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ফলে কুদস ইন্তিফাদা শুরু হয়। হামাস, ইসলামী জিহাদ ও আল আকসা শহীদ ব্রিগেড ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইসতিশহাদী আক্রমন শুরু করে । ফলে ইসরায়েল ভীত হয়ে তাড়াতাড়ি PLO এর সাথে ২০০১ এর জানুয়ারীতে সিনাই এর তাবাতে জরুরী বৈঠক করে। ইতিমধ্যে শ্যারন ভোটে জিতে যায়। আবার ২৭ মার্চ ২০০২ সালে ফিলিস্তীনি মুজাহীদগণ ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে ৩০ জন ইসরায়েলীকে হত্যা করেন। ফলস্বরূপ ইসরায়েল Operation Defensive Shield চালু করে ও ওয়েস্টব্যাংকের সাতটি বড় শহরে সারাদিন ব্যাপি কারফিউ জারী করে।

২০০২ আরব শান্তি পরিকল্পনাঃ

২০০২ সালে আরবলীগের বৈরুত সামিটে সৌদী আরব সমগ্র আরব বিশ্বকে ১৯৬৭ এর যুদ্ধে দখলকৃত অন্চলের ফিরিয়ে দেবার বিনিময়ে ইসরায়েল কে মেনে নিয়ে ইসরায়েলের সাথে শান্তির প্রস্তাব দেয়। একমাত্র লিবিয়া বাদে সবাই এতে সম্মত হয়। ফলে গাজা ও ওয়েস্টব্যাংকে একটি ফিলিস্তীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সংক্রান্ত আরব লিগের খসড়ায় বলা হয় 'A Just Solution to the Palestinian refugee problem'. কিন্তু এখানে 'Right to Return' বা ফিলিস্তিনিদের ফেরার অধিকারের কথা এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বেন্জামিন নেতানিয়াহু এই শর্তকেও অস্বীকার করেন । পরবর্তি PLO প্রেসিডেন্ট মাহমূদ আব্বাস আরব লীগের এই শঠতাপূর্ণ প্রস্তাবকে সমর্থন করেন ও আমেরিকাকে সেগুলো গ্রহণ করার আবেদন করেন। ২০০৯ সালে আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা এই আবেদনে সাড়া দিলেও আম ভাবে কোন বিবৃতি দেন নি।

গাজা হতে ইসরাঈলী সেনা প্রত্যাহার ও হামাসের উত্থানঃ

২০০৫ সালে শ্যারণের নেতৃত্বে একটি দল যারা লেবর পার্টি ছেড়ে কিদামা দলে যোগ দেয় তাদের নিয়ে গাজা হতে সমস্ত সেনা ও ইহুদীদের সরিয়ে নেন। ২০০৬ সালে PLC কতৃক ভোটে হামাস ১২২ সিটের মধ্যে ৭৭ টি আসন পেয়ে বিজয়ী হয়। বিজয়ের পর হামাস ঘোষণা দেয় যে, তারা ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধবিরতী বাড়াতে চায়। হামাসের বিজয়ের ফলে The Quatret বিরক্ত হয়ে PA কে দেওয়া অর্থনৈতিক সমর্থন বাতিল করে ও ইসরায়েল PAএর পক্ষে কর নেওয়া বাতিল করে। হামাসকে হঠাতে আমেরিকা মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফাতাহ কে সেনা ও অস্ত্র সমর্থন দেয়। ফলে ২০০৭ সালে ফাতাহ হামাসের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করলে হামাস ও ফাতাহের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয় ও ওয়েস্টব্যাংক ও গাজার মধ্যে আধিপত্য হামাস ও ফাতাহের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।

তুরস্ক কতৃক হামাসকে সমর্থনঃ

২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল মিশরের রাষ্ট্রপতি হুসনী মুবারকের সহায়তায় হামাস শাসিত গাজার উপর অবরোধ জারী করে। ২০০০ সালের মে মাসে তুরস্কের সরকার হামাসের প্রতি সমর্থন জানায় ও Islamist Humanitarian Relief Foundation স্পনসর্ড Mavi Marmara নামক ফ্লোটিলা পাঠায় গাজার মজলুমের সহায়তায়। এতে ইসরায়েল আঘাত করলে কিছু বেসামরিক ওসমানী মারা যান । ফলে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে দুরত্ব বাড়তে থাকে। পরে মুসলিম বিশ্বের নায়ক , আল্লাহর রহমত সুলতান এরদোগান হাফিযাহুল্লাহ রাষ্ট্রপতি হলে তুরস্ক হামাস সহ ফিলিস্তীনকে পূর্ণ সমর্থন জানায় ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করে। 

ওলমার্ট-আব্বাস গোপন চুক্তিঃ

এরিয়েল শ্যারন কোমায় ভর্তি হলে কিদমার সদস্য ইহুদ ওলমার্ট তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর হতে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফাতাহ প্রেসিডেন্ট মাহমূদ আব্বাস ও ওলমার্ট গোপনে চুক্তি করেন যা একটি এগ্রিমেন্টের দ্বারপ্রান্তে আসে। কিন্তু আরবের বিখ্যাত স্বনামধন্য পত্রিকা ২০১১ সালে আল জাজিরা 'The Palestine Papers' নামে এই গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়। পরে আব্বাস ও ওলমার্ট এই কথা স্বীকার করেন যে তাঁরা ফিলিস্তীনিদের অস্ত্রহীন করতে একটি ন্যাক্করজনক চুক্তি করেছিলেন।

এতক্ষনে আমরা ফিলিস্তীনের ইতিহাস ও পাশ্চাত্য সমর্থিত আরবের শাসনে থাকা গাদ্দারদের গাদ্দারীকে জানলাম। বর্তমানে আরবের শাসনে থাকা মুনাফিকরা নিজেদের স্বার্থে ফিলিস্তীনকে ইসরায়েলের কাছে বিক্রি করতে চায়। সেই চক্রান্তকে বানচাল করতে তুরস্ক কে আল্লাহপাক উম্মাহের জন্য রহমত করেছেন। আমরা সবাই মজলুম ফিলিস্তীনিদের ও মজলুম মুসলমানের সমর্থনে সর্বদা ওসমানী তুরস্কের পাশে থাকব‌ ও তাদের সহায়তা ও তাদের জন্য দুয়া করব ইন শা' আল্লাহ। 

 লেখায়ঃ মুহাম্মাদ ইয়াসির আরফাত মল্লিক।

2 comments:

Theme images by PLAINVIEW. Powered by Blogger.