Header Ads

কারাগারে সাইয়েদ কুতুব রহ. এর ঈমানি পরীক্ষা !

সাইয়েদ কুতুব শহিদ রহ.। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইসলামিক স্কলার। মিসরে ইসলামি আন্দোলনের পুরোধা ও তাত্ত্বিক পুরুষ। যিনি তার বিখ্যাত তাফসির ‘ফি জিলালিল কুরআন’সহ কালজয়ী সব রচনার মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন। ক্ষণজন্মা এ মনীষী ১৯০৬ সালে মিসরের সম্ভ্রান্ত কুতুব বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হাজী ইবরাহিম কুতুব ও মা ফাতিমা হোসাইন ওসমান। সহোদর পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সাইয়েদ কুতুব ছিলেন সবার বড়। তার সব ভাইবোনই উচ্চশিক্ষিত এবং তারা ইসলামি আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ায় কঠোর ঈমানি পরীক্ষার মুখোমুখি হন। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন সাইয়েদ কুতুব শহিদ রহ.। তার আত্মত্যাগ এখন ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণা। সাইয়েদ কুতুব শহিদ রহ. ১৯৫৩ সালে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সদস্য হন। এরপর তিনি দলের তথ্য ও প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি, ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে সাইয়েদ কুতুব ইখওয়ান পরিচালিত সাময়িকী-ইখওয়ানুল মুসলিমুন-এর সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ পান। দায়িত্ব পাওয়ার ৬ মাস পরেই বৃটেনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সমালোচনা করায় জামাল আবদুন নাসের সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। পত্রিকা বন্ধ করার পর মিসর সরকার ইখওয়ান কর্মীদের উপর কঠোর নির্যাতন শুরু করে এবং এক বানোয়াট হত্যা-ষড়যন্ত্র মামলার অভিযোগে দলটিকে বেআইনি ঘোষণা করে। দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। তখন সাইয়েদ কুতুবও গ্রেফতার হন। গ্রেফতারের সময় তিনি ভীষণভাবে জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। সামরিক অফিসার তাকে গ্রেফতার করে হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে দেয়। কোন গাড়ির ব্যবস্থা না করে জেল পর্যন্ত হেঁটে যেতে বাধ্য করে। অসুস্থতার কারণে চলতে গিয়ে তিনি বার বার বেহুশ হয়ে পড়েন। তবুও তাকে পায়ে হাঁটা থেকে রেহাই দেয়া হয় নি। জেলে প্রবেশ করার সাথে সাথে হিংস্র জেল কর্মচারীরা তাকে নির্মমভাবে মারপিট করতে থাকে এবং লাগাতার দুই ঘণ্টা এ অত্যাচার চলতে থাকে। অত্যাচারে আহত সাইয়েদ কুতুবের উপর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কুকুর লেলিয়ে দেয়া হয়। কুকুরটি তার পা কামড়ে ধরে জেলের আঙ্গিনায় টেনে নিয়ে বেড়াতে থাকে। নির্মম অত্যাচারে অভ্যর্থনা শেষ হওয়ার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি নির্জন কক্ষে। সেখানে একটানা সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রক্তাক্ত বেদনায় জর্জরিত শরীর এসব শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করার মতো ছিল না। তিনি বেহুশ হয়ে যান। তার ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে ইউসুফ আজম লিখেছেন, ‘সাইয়েদ কুতুবের ওপর বর্ণনাতীত নির্যাতন চালানো হয়। আগুন দ্বারা সারা শরীর ঝলসে দেয়া হয় পুলিশের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর লেলিয়ে দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান রক্তাক্ত করা হয়। মাথার ওপর কখনো টগবগে গরম পানি ঢালা হয়। পরক্ষণে আবার খুবই শীতল পানি ঢেলে শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা করা হয়। পুলিশ লাথি, ঘুষি মেরে একদিক থেকে অন্য দিকে নিয়ে যেতো।’ এভাবে নির্মম নির্যাতনের ফলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৫৫ সালের ২ মে তাকে সামরিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। ওই বছরের ১৩ জুলাই মহকুমাতুস সাব অর্থাৎ জাতীয় আদালতে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। পরে এ দণ্ড বাতিল করে ১৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। এক বছর কারাভোগের পর সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়, তিনি যদি গণমাধ্যমে ক্ষমার আবেদন করেন, তাহলে তাকে মুক্তি দেয়া হবে। এ প্রস্তাবের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি এ প্রস্তাব শুনে অত্যন্ত আশ্চার্যান্বিত হচ্ছি, জমলুমকে জালিমের কাছে ক্ষমার আবেদন জানাতে বলা হচ্ছে। খোদার কসম। যদি ক্ষমা প্রার্থনার কয়েকটি শব্দ আমাকে ফাঁসি থেকেও রেহাই দিতে পারে, তবুও আমি এরূপ শব্দ উচ্চারণ করতে রাজি নই। আমি আল্লাহর দরবারে এমন অবস্থায় হাজির হতে চাই, যেন আমি তার প্রতি এবং তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট।’ তাকে যতোবারই ক্ষমা প্রার্থনা করার কথা বলা হয় তিনি ততো এই বলে জবাব দিয়েছেন, ‘যদি আমাকে যথার্থই অপরাধের জন্য কারারুদ্ধ করা হয়ে থাকে, তাহলে আমি এতে সন্তুষ্ট আছি। আর যদি বাতিল শক্তি আমাকে অন্যায়ভাবে বন্দি করে থাকে, তাহলে আমি কিছুতেই তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবো না।’ তার এ ঈমানি দৃঢ়তার কারণে তার উপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়া হয়। এমনও হয়েছে একাধারে চার দিন তাকে একই চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে, কোন খাবার-পানীয় দেয়া হয়নি। তার সামনেই অন্যরা উল্লাস করে পানি পান করেছে অথচ তাকে এক ফোটা পানিও দেয়া হয়নি। সাইয়েদ কুতুব ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। ১৯৬৪ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম আরিফের অনুরোধে প্রেসিডেন্ট জামাল নাসের সাইয়েদ কুতুবকে মুক্তি দেয়। কিন্তু তাকে নিজ বাসভবনে অন্তরীণ করে রাখা হয়। ১৯৬৫ সালে মিসরের স্বৈরশাসক জামাল আবদুন নাসের রাশিয়া সফর করেন। ২৭ আগস্ট মস্কোয় আরব ছাত্রদের এক অনুষ্ঠানে ইখওয়ান তাকে হত্যার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন এবং দেশে ফিরে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেন। সাইয়েদ কুতুব আবারও গ্রেফতার হন। গ্রেফতারের সময় তিনি মন্তব্য করেন, ‘আমি জানি অত্যাচারী শাসক এবার আমার মাথাই চায়। তাতে আমার কোন দুঃখ নেই। নিজের মৃত্যুর জন্য আমার কোন আক্ষেপ নেই। আমার বরং সৌভাগ্য যে আল্লাহর রাস্তায় আমার জীবনের সমাপ্তি হতে যাচ্ছে। আগামীকালের ইতিহাস প্রমাণ করবে ইখওয়ানুল মুসলিম সঠিক পথের অনুসারী ছিলো, নাকি এই শাসকগোষ্ঠী।’ মিসরের বিখ্যাত ইসলামি আলোচক শায়খ আবদুল হামিদ কাশাক বলেন, তাকে রাখা হয়েছিলো দরজাহীন একটি রুমে। দরজায় প্লাস্টার করে দেয়া হয়। তাকে এমনভাবে রাখা হয় যেনো তিনি শীতে মারা যায়। তার সেলের সামনেই ছিলো ময়লার স্তুপ। জেলখানার সব ময়লা তার সেলের চারদিকে স্তুপ করা হতো। সাইয়েদ কুতুবসহ ইখওয়ানের নেতা-কর্মীদের বিচার প্রকাশ্যে করার ঘোষণা দিলেও তা করা হয় রুদ্ধদ্বার অবস্থায়। সামরিক শাসকদের ভয়ে আসামীদের পক্ষে কোন উকিল ছিল না। অন্য দেশ থেকে আইনজীবীগণ আসামী পক্ষ সমর্থনের আবেদন করলে তাও প্রত্যাখ্যান করা হয়। এমনকি সুদানের দু’জন আইনজীবী কায়রোর বার এসোসিয়েশনে নাম রেজিস্ট্রি করে আদালতে হাজির হন। পুলিশ তাদের আদালত থেকে ধাক্কা মেরে বের করে দেয় এবং মিসর ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ১৯ মে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত আদালতে বিচারের নামে মহা প্রহসন দেখে বিশ্ববাসী। ট্রাইব্যুনালের বিচারক জামাল নাসেরের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করে ১৯৬৬ সালের ২১ আগস্ট রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সাইয়েদ কুতুবসহ অভিযুক্ত ৪৩ জন নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তারা হচ্ছেন সাইয়েদ কুতুব, মুহাম্মদ ইউসুফ, আবদুল ফাত্তাহ ইসমাইল, শবরি আরাফাত, আহমদ আবদুল মজিদ, আবদুল আজিজ ও আলি উসমাভি। সাইয়েদ কুতুব মৃত্যুদণ্ডাদেশ শোনার বিচলিত হলেন না। বরং তিনি খুশি মনে বলেলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ’! আমার কাছে এটা কোন বিষয় নয়, আমি কোথায় মরতে যাচ্ছি এবং কিভাবে অত্যাচারীরা আমার মৃত্যুদণ্ড দেবে। আমি তো এতেই সন্তুষ্ট যে, আমি আল্লাহর একজন অনুগত বান্দা হিসাবে শাহাদতের পেয়ালা পান করতে যাচ্ছি।’ সাইয়েদা জয়নব গাজালি লেখেন, মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়ার পাঁচ দিন পর সাইয়েদ কুতুব কারাগারে আটক ছোট বোন হামিদা কুতুবকে দেখতে তার কক্ষে যান। ছোট বোন তাকে দেখে বলেন, ‘ধন্যবাদ, প্রিয় ভাই সাইয়েদ! এটা আমার জন্য এক দুর্লভ মুহূর্ত। আপনি আমার পাশে একটু বসুন।’ সাইয়েদ কুতুব পাশে বসলেন। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হলো। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিলেন। হামিদা কুতুব মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভাইকে দেখে বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। কিন্তু সাইয়েদ কুতুবের সাথে কিছু কথা বলার পর হামিদা কুতুবের মুখেও হাসির রেখা ফুটে উঠে। ২৮ আগস্ট রাতে সাইয়েদ কুতুব ও তার দুই সাথীকে ভোররাতে ফাঁসির সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ইতোমধ্যে ফাঁসির সকল আয়োজন শেষ। সাইয়েদ কুতুব হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে উঠলেন। চারদিকে ভেসে উঠল ফজরের আজান। এমনি এক পবিত্র পরিবেশেই লেখা হলো ইসলামের জন্য আত্মোৎসর্গের পবিত্রতম ইতিহাস। আল্লাহতায়ালা যেন ইসলামি আন্দোলনের এই প্রিয় নেতাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন,আমিন ইয়া রাব্বাল আল'আমীন ।

No comments

Theme images by PLAINVIEW. Powered by Blogger.