ন্যাটো জোটের সাথে তুরস্কের বর্তমান সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ ।

১১আগস্ট২০১৮,
বর্তমানে রাশিয়ান বিরুধী বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক জোট ন্যাটোর (NATO) সাথে তুরস্কের সম্পর্কের কারনে অনেকেই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দিকে আড় চোখে তাকান যেটা সাধারণত আবেগী বাংলাদেশীয় কিছু ভাই-বোনদের দ্বারা বেশি হয়ে থাকে ।
সকল বাংলাভাষাভাষীদের ভুল শুধরে দিতেই আমার এই আর্টিকেলটি লিখার মূল উদ্দেশ্য।
আমি আর্টিকেলটিকে তিনটি  ভাগে ভাগ করেছিঃ
·         ন্যাটো কি ও এর গঠনের ইতিহাস
·         তুরস্ক কখন এবং কেন ন্যাটোতে জোট করেছে
·         ন্যাটোর সাথে তুরস্কের বর্তমান সম্পর্ক
ন্যাটো কি ও এর গঠনের ইতিহাসঃ 
উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটো (North Atlantic Treaty Organization বা NATO  ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সামরিক সহযোগিতার জোট। ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা প্রদানে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ে অবস্থিত উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  কানাডা এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই জোটের সদস্য।এছাড়া তুরস্কও এই জোটের সদস্য।ন্যাটো একটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষা গোষ্ঠী। এর সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবস্থিত। ন্যাটোর বর্তমান সদস্য-দেশের সংখ্যা ২৯ ন্যাটোর সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর খরচ পৃথিবীর সকল দেশের সামরিক খরচের প্রায় ৭০ ভাগ। প্রতিষ্ঠার প্রথম দুই বছর ন্যাটো একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ছিলকিন্ত কোরিয় যুদ্ধের পর ন্যাটো সদস্যরা চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুই জন সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডারের অধীনে একটি সমন্বিত সামরিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়। ন্যাটোর প্রথম মহাসচিব ছিলেন লর্ড ইসমে। তিনি ১৯৪৯ সালে বলেন যে, "এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হল রাশিয়ানদের দূরে রাখাআমেরিকানদের কাছে আনা এবং জার্মানদের দাবিয়ে রাখা"
১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হলে ন্যাটো যুগোস্লাভিয়ার দিকে মনোনিবেশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত বসনিয়ায় ন্যাটো মধ্যস্ততামূলক সামরিক অভিযান চালায় এবং পরে ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভিয়ায় অভিযান চালায়।
তুরস্ক কখন এবং কেন ন্যাটোতে জোট করেছেঃ
তুরস্ক ১৯৫২ সালে ন্যাটোতে যোগদান করে।তবে, কেউ হয়তো ভাবতে পারে যে তুরস্ক কেন আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্ব দিকে ২000 মাইল দূরে অবস্থিত "উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা" নামে পরিচিত একটি সংস্থাতে যোগ দিল। তার উত্তর হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে রাশিয়ার আক্রমন থেকে তুরস্ককে মুক্ত করতে এটা ছিল সামরিক কৌশল কেননা ন্যাটোর নীতি হল যদি কোন সদস্যদেশ অন্য কোন দেশ থেকে আক্রমনের স্বীকার হয় তবে ন্যাটোর সকল দেশ তা প্রতিহত করবেতুরস্কে তখন ক্ষমতায় ছিলেন শহিদ আদনান মেন্ডারাস(যাকে পরবর্তিতে সেকুলার সেনাবাহীনি আরবিতে আযান দেওয়ার অনুমতি প্রদান করার অপরাধে ফাসিতে ঝুলিয়ে শহিদ করেছে)যিনি ছিলেন কমিউনিস্ট বিরুধি মানুষ । সোভিয়েত ইউনিউনের কমিনিজমের বিরুধি হওয়ায় ন্যাটোভুক্ত অন্যদেশগুলো তুরস্ককে জোটভুক্ত করে।
অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিউনের সামরিক হুমকির কবলে পতিত তুরস্ক যখন একা মোকাবেলা করা সম্ভব নয় মনে করল তখনই সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসি কমিউনিজমের প্রভাব তুরস্কে বাড়তে থাকল। সোভিয়েত ইউনিয়ন তুরস্কের ইস্তানবুল যা কিছু অংশ ইউরুপকে ও বৃহৎ অংশ এশিয়াকে নিয়ে আছে অর্থাৎ বসফরাস প্রনালী পর্যন্ত অবরুদ্ধ করার চেষ্টা চালাল। তখন তুর্কি সরকার নিজের দেশের মানচিত্রকে রক্ষা করার জন্য একান্ত বাধ্য হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিরুধি সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগদান করে যার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়া সফল হয়নি ।

ন্যাটোর সাথে তুরস্কের বর্তমান সম্পর্ক
:
 
কিছু দিন আগে নরওয়েতে ন্যাটোর যৌথ যুদ্ধমহড়ায় একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জের ধরে তুরস্ক ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় এবং দেশটির সরকার ও বিরোধী দল সবাই এক হয়ে এ ব্যাপারে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তাদের অভিযোগমার্কিন নেতৃত্বাধীন এই সামরিক জোটের পক্ষ থেকে আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক এবং তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের অবমাননা করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছেতাহলে কি তুরস্ক ন্যাটো ত্যাগ করতে যাচ্ছেকিংবা এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার উপযুক্ত সময় কি এটাই?
প্রায় সাত দশক পুরনো উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা ন্যাটোর মহাসচিব জেন্স স্টোলটেনবার্গ ও অন্যরা নরওয়েতে সংঘটিত ওই অঘটনের ব্যাপারে তুরস্কের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তবে এতে তুরস্কের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সাফ কথাশুধু মাফ চাইলেই হবে না। শুধু আমি নিজে নইতুরস্ক রাষ্ট্রকে টার্গেট করে এই কেলেঙ্কারি ঘটানো হয়েছে। ঘটনাস্থল নরওয়ের স্ট্যাভাঙ্গার নামক স্থানে অবস্থিত ন্যাটোর জয়েন্ট ওয়্যারফেয়ার সেন্টার। ২০১৭ সালের নভেম্বরে এই ঘটনাটি ঘটেছে ।
তুরস্কের প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা, ‘সাবাহর কলামে বলা হয়েছেএকটি অদৃশ্য হস্ত ন্যাটোর মতো পাশ্চাত্যভিত্তিক সংস্থাগুলো থেকে তুরস্ককে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে আঙ্কারার এই ফাঁদে পা রাখা ঠিক হবে না।
বাস্তবতা হলোকিছু দিন ধরে পশ্চিমা দুনিয়ার সরকারগুলো তুরস্কবিরোধী মানসিকতা তৈরির কাজে মদদ দিয়েছে। এর পরিণামে এবার ন্যাটোর মহড়ায় অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে যায় তুরস্কের বিরুদ্ধে। ন্যাটো ও নরওয়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ক্ষমা প্রার্থনা সত্ত্বেও তুরস্কের উদ্বেগ কমেনি। এ পরিস্থিতিতে তুরস্ক-ন্যাটো সম্পর্ক গত কয়েক বছরে কোথায় পৌঁছেছেতা উপলব্ধি করা যায়। ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই সংঘটিত তুরস্কের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের ব্যাপারে ন্যাটোর দৃষ্টিভঙ্গি তুরস্কের মনঃপূত নয়। তদুপরি সে অভ্যুত্থানের হোতা হিসেবে অভিযুক্তফতেহউল্লেহ গুলেনের লোকজনকে তুরস্ক সরকারের হাতে তুলে না দেয়ার ঘটনা ন্যাটোর প্রতি আঙ্কারার আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক আগের মতো উষ্ণ নয়। এ বিষয়ও ন্যাটোর প্রতি তুর্কি মনোভাবের ওপর পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলেছে।
গত কয়েক বছরে তুরস্কের কর্মকর্তারা বারবার বলেছেনকুর্দিদের পিকেকের মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠন এবং গুলেনপন্থী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তুরস্ক অন্যদের পাশে পায়নি। এ দিকে রাশিয়ার এস-৪০০ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম তুরস্ক কিনবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশ্চাত্যের মিডিয়া প্রচারণা চালিয়েছেএই পদক্ষেপ ন্যাটোর চেতনার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।’ পাশ্চাত্যে বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে কিছু মহল তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে একনায়করূপে চিহ্নিত করে ন্যাটো থেকে তুরস্ককে বিদায় করে দেয়ার দাবিতে প্রপাগান্ডায় ব্যস্ত। এমন এক প্রেক্ষাপটে কামাল আতাতুর্ক (তুরস্কের জাতির পিতা’) এবং তুরস্কের বর্তমান নেতা এরদোগানকে ন্যাটোর দুশমন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠেছেন্যাটো জোটে তুরস্কের আর থাকা সমীচীন কি না।
ন্যাটোর ব্যাপারে সন্দেহপ্রবণ মহলের অভিযোগন্যাটো তুরস্কের জাতীয় স্বার্থকে নির্লজ্জভাবে অবহেলা করে আসছে। তাদের ধারণা১৯৬০ সালে জেনারেল জামাল মুরসেলের সামরিক অভ্যুত্থান এবং গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতের সময় থেকে তুরস্কের সব অভ্যুত্থানের পেছনে পাশ্চাত্য জোট ন্যাটোর হাত ছিল। অতএবএই জোটকে বিশ্বাস করা যায় না। এমনকি আঙ্কারার প্রতি প্রকাশ্য বৈরী’ ন্যাটো ত্যাগ করার জন্য তুর্কি সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে দায়িত্ব পালনের প্রথম বছর ফুরিয়ে আসছে। এ দিকে তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আগের মতোই চাপের মুখে রয়ে গেছে। কুর্দিদের পিপলস প্রটেকশন ইউনিট (ওয়াইপিজি) মিলিশিয়ার প্রতি মার্কিন সমর্থনগুলেনপন্থী সন্ত্রাসী গ্রুপকে (ফেটো) যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারে ব্যর্থতাপ্রতিরক্ষা ইস্যুতে তুরস্কের সাথে সহযোগিতা করায় ওয়াশিংটনের অনীহা, (পরমাণু ইস্যুতে) ইরানসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে নিউ ইয়র্কে চলমান মামলা প্রভৃতি এই দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তুরস্ক আর যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে একটা পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে এটা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের দরুন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাইকৌশলগত অংশীদারিত্ব’ কথাটা এখানে প্রায় অর্থহীন। রাশিয়ার সোচিতে ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আঙ্কারার সাথে ওয়াশিংটনের বন্ধন মেরামত করার একটা চেষ্টা চালিয়েছেন। এ জন্য তিনি তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে বললেনকুর্দি জঙ্গিদের অস্ত্র জোগানোর মতো অর্থহীন কাজ তিনি বন্ধ করে দিচ্ছেন। তবে পেন্টাগনের কর্তাব্যক্তিরা কুর্দিদের এই গ্রুপের সাথে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনরায় ব্যক্ত করেছেন। এ অবস্থায় তুরস্ক হয়েছে বিভ্রান্ত।
যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট হাউজপররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পেন্টাগনের মাঝে কিছু মতভেদ রয়েছেযা বোঝা কষ্টকর নয়। ট্রাম্প প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ইস্যুগুলোর সুরাহা করতে না পারায় যে ব্যাপক বিভ্রান্তি বিরাজ করছেএই মতভেদ তারই ইঙ্গিত দেয়। তবে অনেকেই মনে করেনমার্কিন পররাষ্ট্রনীতির দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত সত্ত্বেও আঙ্কারার সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করার জন্য হোয়াইট হাউজের প্রয়াসকে তুরস্ক স্বাগত জানিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান পেন্টাগনের উপরি উক্ত বক্তব্যকে উপেক্ষা করেছেন। তিনি এটা স্পষ্ট করে দিলেনযুক্তরাষ্ট্রে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছেশুধু প্রেসিডেন্ট বা হোয়াইট হাউজের ভূমিকা। এরদোগান বলেছেনপ্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে ফোনালাপে আমরা দুজন সম্প্রতি প্রথমবারের মতো একই ধরনের চিন্তা করেছি দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ে। কুর্দি মিলিশিয়া ও গুলেনপন্থীদের সন্ত্রাসসহ কয়েকটি ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি তার সাথে। কয়েক সপ্তাহ ধরে আমাদের এই সংলাপ চলবে।
এ দিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন রাশিয়া আর ইরানের সাথে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। টিলারসনের এই বক্তব্য প্রদান করাকে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রিত্ব জাহির করার একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেও গণ্য করা যায়। কারণতিনি ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রভাবশালী কন্যা ইভাঙ্কার ভূমিকার সামনে ম্লান হয়ে পড়েছেন। ইভাঙ্কাকে আমেরিকার ডি ফ্যাক্টো সেক্রেটারি অব স্টেট’ বা আসল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করা হচ্ছে।
যা হোকরেক্স টিলারসন উইলসন সেন্টারে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনটি পয়েন্ট তুলে ধরলেন যেগুলো পরস্পর সম্পর্কিত। এগুলো হচ্ছেইউরো-মার্কিন মৈত্রীর ভবিষ্যৎরুশ হুমকির উত্থান এবং ন্যাটোতে তুরস্কের সদস্যপদের সুফল। ইউরোপে যারা ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত এই সংস্থার জন্য তাদের প্রদেয় আর্থিক অনুদানের পরিমাণ বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন আহ্বান জানিয়েছে। এটাকে টিলারসন বলেছেন নতুন অঙ্গীকার এবং ন্যাটো জোটের পুনরায় সংজ্ঞায়ন। তিনি রাশিয়ার দিক থেকে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে বলেনআমেরিকা ও ইউরোপ চায় রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতেকিন্তু রাশিয়ানরা চেষ্টা করেছে ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে বিভেদের ফাঁক তৈরি করার জন্য। সাইবার হামলা এবং এর সাথে নির্বাচনে নাক গলাতে মিথ্যা প্রপাগান্ডার মাধ্যমে এটা করা হয়েছে বলে টিলারসন উল্লেখ করেন। তিনি ইরানকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ওয়াশিংটনের পরিকল্পনায় সায় দিতে ইউরোপের প্রতি আহ্বান জানান।
তুরস্ক প্রসঙ্গে অনুষ্ঠানে রেক্স টিলারসন বলেছেন, ‘ন্যাটোর মিত্র হিসেবে তুরস্ককে বলেছিতার সাথে চুক্তিবদ্ধ মিত্রদের সাথে অভিন্ন প্রতিরক্ষার বিষয়টিকে যেন অগ্রাধিকার দেয়া হয়।’ তুরস্কের জন্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের অপরিহার্যতা’ বোঝাতে গিয়ে টিলারসন মার্কিন প্রশাসনের মনোভাব তুলে ধরে বলেন,পাশ্চাত্যের জাতিগুলোর সম্প্রদায়ের (অর্থাৎ ন্যাটো) সদস্য হয়ে তুরস্ক যত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুফল পাবেতা ইরান ও রাশিয়া তুরস্ককে দিতে পারবে না।
টিলারসন ন্যাটোতে থাকা যে লাভজনক’, সেটা তুরস্ককে মনে করিয়ে দিলেন। এটা কিছু মার্কিন মিডিয়ার মনোভাবের চেয়ে বেশি যুক্তিসঙ্গত। এসব মিডিয়ার সোজা কথা, ‘ন্যাটো থেকে লাথি মেরে তুরস্ককে বের করে দিতে হবে।’ অপর দিকে চতুর টিলারসন তুরস্ক-আমেরিকা সম্পর্কের লাভ তুলে ধরলেও লোকসানটা লুকিয়ে রাখতে চেয়েছেন। সে লোকসান হলোসাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্কের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ভুল পলিসির জন্য দেয়া মাশুল। টিলারসন ইউরোপ থেকে আরো বেশি অর্থ চাচ্ছেন ন্যাটোর জন্য। কিন্তু ন্যাটো বছরের পর বছর তুরস্কের নিরাপত্তার মতো গুরুত্ববহ বিষয়কে অবহেলা করে এসেছেএ ব্যাপারে তিনি চোখ বুজে আছেন। তুরস্ক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে লড়াই চালিয়ে আসছে। অথচ কথিত অভিন্ন প্রতিরক্ষার মূলনীতি বাস্তবায়নে ন্যাটো জোট অস্বীকৃতি জানিয়ে এ লড়াইয়ের বিরাট ক্ষতি করেছে। আর কুর্দি ওয়াইপিজি কিংবা গুলেনপন্থী ফেটো’ ইস্যুর দিকে নজর দিলেই বোঝা যায়এসব ক্ষেত্রে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই ন্যাটোর স্বার্থহানি করেছে। এখন ন্যাটোর সাথে তুরস্কের সম্পর্ক যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছেতাতে কথিত মার্কিন স্বার্থ প্রণোদিত এই জোটের ওপর কতটা নির্ভর করা যায়এ প্রশ্ন দেখা দেয়। তদুপরি ন্যাটোকে কেন্দ্র করে এক দিকে পাশ্চাত্যে তুরস্কবিরোধী মনোভাব এবং অপর দিকে তুরস্কে পাশ্চাত্যবিরোধী মনোভাব জন্ম নিয়েছে।
শীতলযুদ্ধ’ শেষ হওয়ায় এখনই তুরস্ক সবচেয়ে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। তাই তুরস্ক দেশটির নিরাপত্তা সমস্যার সুরাহার জন্য ন্যাটোর চিন্তাভাবনা থাকা জরুরি। সিরিয়া ও ইরাক থেকে আগত গোলযোগ ও সন্ত্রাসের জোয়ারের মুখে আঙ্কারাকে একা ফেলে তার স্বঘোষিত মিত্ররা সরে পড়েছে। যতই দিন যাচ্ছে,আরো বেশি তুর্কি নাগরিক বিশ্বাস করছেনপ্রতিরোধমূলক ও গতানুগতিক নিরাপত্তা- এ উভয় ক্ষেত্রেই ন্যাটো তুরস্কের প্রতি তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। তা ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকার কুর্দিদের পিকেকে এবং গুলেনপন্থী ফেটো (FETO) উগ্রপন্থীদের আশ্রয় দিয়ে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটিয়েছে। এমন এক সময় এসব করা হচ্ছেযখন খোদ যুক্তরাষ্ট্র ফতেহউল্লেহ গুলেন এবং কুর্দিদের জঙ্গি সংগঠন ওয়াইপিজিকে আশ্রয় বা সমর্থন জোগাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন বলা যায়ন্যাটোর পুনঃসংজ্ঞায়ন’-এর সঠিক পন্থা হলোন্যাটোর সদস্যপদ ধরে রাখার উপকারিতা স্মরণ করানোর বদলে এর সব সদস্যের নিরাপত্তাজনিত স্বার্থ সমুন্নত করা। এ দায়িত্ব পালনে নেতৃত্ব দিতে হবে আমেরিকাকেই।

No comments

Theme images by PLAINVIEW. Powered by Blogger.