Header Ads

মেডিকেলে রাজনীতি: স্বপ্ন বনাম ধ্বংস

লেখক Marufur Rahman Opu হলেও আমার ও মনের কথা -----

"লেখাটি পড়ার পর ফ্রেন্ডলিস্টের অনেকেই হয়তো আমাকে অপছন্দ করা শুরু করবেন। তবুও আমি বলবো।

সেদিনের সন্ধ্যাটাও এমনই এক শীতের সন্ধ্যা ছিলো। কোন একটি মেডিকেল কলেজের বয়েজ হোস্টেল। জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষনা হবে কিছু সময়ের মাঝেই। তাই একই ছাত্রাবাসে একই রাজনৈতিক মতাদর্শের দুটি "গ্রুপ/লবিং" এর মাঝে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্ব স্ব গ্রুপের বড় ভাইয়েরা তাদের ছোট ভাইদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার, খোলাদ্বার ইত্যাদি নানা রকম মিটিং সম্পন্ন করেছেন এবং "প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি" ও নেয়া হয়েছে। তো নির্বাচনী ফলাফল যখন প্রায় নিশ্চিত সেসময় দুটি গ্রুপই আলাদা আলাদাভাবে রুম দখল অভিযান শুরু করলো, "আলিফ-লায়লায়" যেভাবে চক দিয়ে চল্লিশ চোরেরা মার্ক করে রাখতো ঠিক সেরকম মার্কিং হলো।

যেখানে দখল আছে সেখানে লড়াই অনিবার্য। সুতরাং মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ানো দুটি গ্রুপ। প্রতি গ্রুপেই ১ম বর্ষ থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত মেডিকেল ছাত্ররা, কারো হাতে লাঠি, কারো হাতে.... ইত্যাদি। একে অপরকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে লাঠি দিয়ে দেয়ালে আঘাত, তীব্র চিৎকার ইতাদি চলছে, ভীতি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে যে যার হাতের কাছের রুমের জানালা ভাঙা শুরু করলো। অত:পর সংখ্যায় ভারি দলটি অন্য দলের উপরে আক্রমন শুরু করে, কিছু সময় প্রতিরোধ চেস্টায় ব্যার্থ হয়ে আক্রান্ত দলটি পালানো শুরু করে, কেউ আশেপাশের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে খাটের নিচে ঢুকে যায়, কেউ বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়, হোস্টেল ছেড়ে বাইরে পালিয়ে যাবার পথ নেই ওটা আক্রমনকারীদের দখলে। পালিয়ে রক্ষা হয়নি, ক্রোধে (কিসের?) উন্মত্ত আক্রমনকারীদের চাপে কাঠের দরজাগুলো ভেংগে যায়, খাটের নিচে লুকিয়ে থাকা ছেলেগুলোকে বের করে এনে বেধড়ক পেটানো হয়। এরপর যারা টয়লেটে লুকিয়েছিলো তাদের জব্দ করার জন্য একটি অভাবনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়। টয়লেটের দরজার সামনে একটি ভাংগা চৌকি ফেলে তাতে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দাও! বাস, তাই হলো, বাইরে আগুন জ্বলছে, ধোয়া ঢুকছে টয়লেটে, তাতে ৮-১০ জন মানুষ অপেক্ষা করছে কখন এই ধোয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাবে কিংবা কেউ এসে তাদের উদ্ধার করবে। পুলিশ এসে উদ্ধার করেছিলো শেষ পর্যন্ত তবে হ্যা, আক্রমনকারীদের কিছু হয়নি। আক্রান্তদের দখলকৃত রুমের দরজা জানালা, কম্পিউটার, বইখাতা, মূল্যবান সামগ্রীর কি হয়েছিলো বলাই বাহুল্য।

শেষ কি? অবশ্যই নয়। মানুষ মাত্রই প্রতিহিংসাপরায়ন সুতরাং, পাটকেলটি আসবেই। এসেছিলো প্রায় দুবছর পর। সেই রাতে আক্রান্তদলটি এবার আক্রমনকারীর ভূমিকায়। আক্রমন শুরু করার আগে একই রকম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হইচই। মজার ব্যাপার হলো তারা সবাই একই বর্ষের, এমনকি কারো কারো পাশাপাশি রোল নাম্বার, পরীক্ষার হলে মিলে মিশে পরীক্ষা দেবার নজির ও আছে তাদের মাঝে! তাতে কি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বলে কথা! সুতরাং আবারো একটি বিভীষিকাময় রাত্রি। আগে থেকে জোগাড় করে রাখা ক্রিকেট স্ট্যাম্পসহ নানারকম লাঠির ব্যবহার চললো। জানা গেল ৬-৭ জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একজন এর অবস্থা শোচনীয়। ছেলেটির একটি চোখসহ মাথায় আঘাত লেগেছে। পরবর্তীতে ছেলেটি সেই চোখের পূর্ণাংগ দৃষ্টি আর ফিরে পায়নি।

পড়ে খারাপ লাগছে আপনাদের? জেনে রাখুন এ ঘটনা প্রায় প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজেই হয়। একটি মেডিকেল কলেজে দেশের অন্যতম সেরা মেধাবীরা প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি হয়। ডাক্তার হয়ে মানুষের শারিরীক কস্ট লাঘবের শপথ নেয়। তার মাঝেই তারা জড়িয়ে পড়ছে এক নস্ট কালচারে। এই ভায়োলেন্স এর চর্চাটি সরকার এবং বিরোধী দলের নয়, এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা স্বাধীনতার সপক্ষ বনাম বিপক্ষ শক্তির নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সরকার দলীয় একাধিক গ্রুপের মাঝে তা যে সরকারই থাকুক।

গত শুক্রবার রাতে একইরকম ঘটনা ঘটেছে দেশের অন্যতম সেরা একটি সরকারি মেডিকেল কলেজে। আহত একজনকে ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষনা করা হয়েছে শুনেছি। এর আগে মেডিকেল ছাত্রাবাসে মারামারির ঘটনায় নিহত হবার ঘটনা নতুন নয়, বেশ কয়েকটি উদাহরন আছে। কেন করছি আমরা এসব? এই ছেলেগুলো কোন এক জাদুমন্ত্রে, হ্যামিলনের বাশির টানে মানসিকভাবে এক ধরনের হিপনোটিক অবস্থায় চলে যাচ্ছে। নিজের শিক্ষা, পরিবেশ, বাস্তবতা, মানবিকতা কিছুই ভাবছেনা। বন্ধুর কিংবা সহপাঠীর উপর ঝাপিয়ে পড়ছে কারন বড় ভাই বলেছেন বলে। তাতে কি লাভ হবে, হয়তো পরীক্ষায় পাশ হওয়া সহজ হবে কিংবা কর্মজীবনে কাংখিত সুবিধা পাওয়া যাবে কিংবা রাজনৈতিক তারকা হওয়া যাবে? সত্যিই কি তাই? কতজন হতে পারে বা পেয়েছে? ক্ষনিকের জন্য হায়নার মত হিংস্র হবার বিনিময়ে কাংখিত সুবিধা পাবার চেস্টা আপনাকে কতখানি "মানুষ" করে, কিংবা কতজন কাংখিত সুবিধা পান?

আমি জানিনা ছাত্ররাজনীতির জনকেরা যে আদর্শ নিয়ে এগুলো তৈরি করেছিলেন তার কতটুকু অবশিস্ট আছে। ছাত্র রাজনীতি এই দেশকে অনেক কিছু দিয়েছে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিলো এই ছাত্ররাই ঢামেক গেট থেকে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করে শহীদ হয়েছিলেন ডা: মিলন। তাদের উত্তরসূরীরা আজ একে অন্যের উপর হামলে পড়ছে একই আদর্শের স্লোগান দিয়ে এই লজ্জা নিয়ে বোধহয় তারা বেচে থাকলে মরে যাওয়ায় শ্রেয় মনে করতেন।

এদেশে ছাত্ররাজনীতির সুস্থ ধারা ফিরে আসুক। প্রতিযোগীতা হোক মেধার, পেশীশক্তির নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একমাত্র আপনিই পারেন দেশের ছাত্র রাজনীতিকে আবার আপনার পিতার আদর্শে উজ্জীবিত করে দেশ গঠনের কাজে লাগাতে। এত লক্ষ লক্ষ ছাত্র সেচ্ছাসেবায়, দেশ গঠনে একদিন করে সময় দিলেও দেশের সকল সমস্যা, দুর্নীতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার কথা। ওরা হামলে পড়ুক সকল প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে, ওরা হামলে পড়ুক জুলুমকারীদের বিরুদ্ধে, হামলে পড়ুক দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে, সম্ভব কি?


লেখক Marufur Rahman Opu হলেও আমার ও মনের কথা -----

No comments

Theme images by PLAINVIEW. Powered by Blogger.