আহলে হাদিসদের গোঁড়ামি!

রুকূ পেলে কী রাকাত গণ্য হব?

এ শিরোনামে জনৈক নব্য মুজতাহিদের একটি লেখা ফেসবুকে পড়লাম। এই মুজতাহিদ সাহেব সমান্য আরবীও জানেন না। তার পরও তিনি সব সময় তার ইজতিহাদ চালিয়ে যান। তার ইজতিহাদের মাধ্যমে বার বার মানুষকে বিভ্রান্ত করেন। আমি ইতঃমধ্যে তাকে বেশ কয়েকবার সতর্ক করেছি। কিন্তু‘ তিনি থেমে যাবার পাত্র নন। তিনি আবার প্রচণ্ড তাকলীদ বিরোধী আহলে হাদীস। ভদ্রলোক যে হাদীসও জানেন না; বুঝেন না; আমার এ লেখা থেকে পাঠক তা বুঝতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। তিনি উক্ত প্নশ্নটি করে জবাবে বলেন,

[[ অবশ্যই না। নবী(সাঃ) হতে স্পষ্ট সহীহ বোখারীর বিশুদ্ধ হাদীস অনুযায়ী তা ঠিক নয়। হাদীসটি উল্লেখ করে নিচে আমার কিছু যৌক্তিক বিশ্লেষণঃ
.আবু বাকরাহ(রা) হতে বর্ণিত যে, তিনি নবী(সাঃ) এর নিকট এমন অবস্থায় পৌঁছুলেন যে, নবী(সাঃ) তখন রূকূতে ছিলেন। তখন কাতার পর্যন্ত পৌঁছার পূর্বেই তিনি রুকূতে চলে যান। এ ঘটনা নবী(সাঃ) এর নিকট ব্যক্ত করা হলে তিনি বলেন যে, আল্লাহ তোমার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দিন। তবে এরকম আর করবে না"
.Reference:
সহীহ বোখারী, অধ্যায়ঃ আযান, পর্বঃ ১০, অনুচ্ছেদঃ ১১৪, হাদীসনং- ৭৮৩ এবং ই.ফাঃ ৭৪৭
.এখন সাধারণ একটি ব্যাপার যে, নবী(সাঃ) যখন যদি কোনো ব্যাপারে 'না-সূচক' ব্যক্ত করেন, তখন সেটা নিশ্চয় হারাম/ নিষিদ্ধ/ না-জায়েজ/ ভুল/ পাপ/ সীমালঙ্ঘন/ বর্জনীয়/ অগ্রহণীয়/ পরিত্যাজ্য এ-রকম সম্পূরক কিছু ব্যাপার নিশ্চিত হয়ে থাকে। যেমনঃ
.পবিত্র ক্বোরআন বলছেঃ
"রাসূল তোমাদিগকে যাহা দেয় তাহা তোমরা গ্রহণ কর এবং যাহা হইতে তোমাদিগকে নিষেধ করে তাহা হইতে বিরত থাক" [সূরা হাশরঃ ০৭]
.এখন পূর্বোক্ত হাদীসটির প্রতি চিন্তা করুন, নবী(সাঃ) সালাতে রূকূতে চলে গেছেন, সাহাবী আবু বাকরাহ(রা)ও দ্রুত এসে রুকূতে চলে গেছেন। পরে নবী(সাঃ) তাকে এরকম আর না-করার হুকুম দিলেন। এখন মূলত প্রশ্নঃ রূকূ পেলে যদি রাকাত গণ্যই হত, তাহলে নবীজী কেন উক্ত সাহাবীকে নিষেধসূচক বাক্য বলবেন? আর নবী যেখানে নিষেধসূচক বাক্য বলেছে, সেটা নিশ্চয় হারাম/ বর্জনীয়/ নিষিদ্ধ কর্মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। অর্থাৎ, সহীহ বোখারীর এ স্পষ্ট হাদীস প্রমাণ করে যে, রুকূ পেলে পূর্ণ রাকাত গণ্য হবে না।
আরও খেয়াল করুন হাদীসে বলা হচ্ছে, 'এ ঘটনা নবী(সাঃ) এর নিকট ব্যক্ত করা হলে' অর্থাৎ, এ সাহাবীর এ ঘটনাটির পূর্বে আদৌ এ-রকম কোনো সাহাবী করেনি। যদি করতই তাহলে দ্বিতীয়বার নবী(সাঃ)-কে এ ব্যাপারে কনফার্ম করার কোনও মানে থাকে না। এ কথা থেকে এটাও দলীল আসে যে, এটার পূর্বে কোনো সাহাবীই যেহেতু হঠাৎ রুকূতে এসে রাকাত গণ্যে শামিল হয়নি। অর্থাৎ, সেহেতু তারা (সাহাবীগণ) এটাকে আদৌ বৈধ হিসেবে গ্রহণ করেনি।
.এখন বাস্তবতা হলো আপনি পৃথিবীর কোন্ মহান হুমড়া-কুমড়া ব্যক্তি, যে-কিনা রাসূলের নিষেধ বাক্য সত্ত্বেও জায়েজ বানাতে উঠে-পড়ে লেগেছেন?]]...

আমাদের এই নব্য মুজতাহিদ ভাই আবু বাকরার যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তা তিনি বুঝেন নাই।কারণ তাতে আছে, وعن أبي بكرة أنه انتهى إلى النبي صلى الله عليه وسلم وهو راكع فركع قبل أن يصل إلى الصف فقال له النبي صلى الله عليه وسلم زادك الله حرصا ولا تعد " (رواه البخاري وزاد أبو داود فيه فركع دون الصف ثم مشى إلى الصف  ‘অবু বাকরা থেকে বর্ণিত। তিনি নবী সা.  রুকুতে থাকাবস্থায় তাঁর কাছে পৌছলেন।তখন তিনি কাতারে পৌছার আগে রুকু করলেন।তখন নবী সা. তাকে বললেন, আল্লাহ তোমার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দিন। তবে এরকম আর করবে না" [বুখারী, আবু দাউদের বর্ণনায় আছে, তিনি কাতোরে পৌছার আগেই রুকু করেছিলেন।তারপর কাতারে পৌছলেন।]
আলোচ্য হাদীসের ولا تعد বাক্যটির দুটি অর্থ করা হয়েছে।এক. কাতারে পৌছার আগে এভাবে সালাতে শামিল হবার কাজটি আর কখনো করবে না। দ্বিতীয় অর্থটি হল, ولا تعد صلاتك فإنها صحيحة তোমার সালাত পূনরায় পড়বে না। কারণ তা সাহীহ হয়েছে।[দেখুন, সুবুলুস সালাম, খ.২, পৃ:২৪৬]
আমরা মনে করি দুটি অর্থই সাহীহ।এই দটি অর্থ মতেই দেখা যাচ্ছে যে আবু বাকারা সুরা ফাতিহা পড়ার সুযোগ না পাওয়া সত্বেও  নবী সা. তাকে তার সালাত পুনরায় পড়তে নিষেধ করেছেন।রুকু পাওয়ার পরও যদি তার রাকাতটি গণ্য না হত; তাহলে নবী সা. তাকে অবশ্যই পুনরায় সালাত পড়ার আদেশ করতেন।সুতরায় বুঝা গেল রুকু পাওয়া গেলে রাকাত গণ্য হবে। আমাদের এ বক্তব্যের পক্ষে নিম্নের হাদীসগুলো সাক্ষি হিসেবে পেশ করা যায়।
১. আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা.বলেন, যখন তোমরা আমরা সিজদা রত অবস্থায় সালাতে আসবে তখন তোমরাও সিজদা করবে। আর সে রকাতকে কিছুই গণ্য করবে না। আর যে ব্যক্তি রাকাত পেল সে সালাত পেল। [আবু দাউদ, খ:১, পৃ,১৬৯, হা:৭৯২; নাসির উদ্দিন আলবানী হাদীসটি হাসান বলে মন্তব্য করেছেন।আবার তিনি এরওয়াউল গালিলে হাদীসটি সাহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। খ,২, পৃ,২৬০]
২. আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিনের (জুমার সালাতের) শেষ রাকাতের রুকু পাবে সে যেন তার সাথে আরো একটি রাকাত যুক্ত করে। আর যে ব্যক্তি শেষ রাকাতের রুকু পাবে না সে যেন যুহরের চার রাকাত সালাত আদায় করে। [দারা কুতনী, খ.২, পৃ.৩২০] এ হাদীস থেকে জানা যায় জুমার সালাতের শেষ রাকাতের রুকু পেলে তার এক রাকাত সালাত হয়ে যায়; তাই তাকে তার সাথে আর একটি রাকাত যুক্ত করতে বলা হয়েছে। আর যদি এক রাকাত সালাত তার হয়ে না যেত; তবে তাকে চার রাকাত বা কমছেকম দুই রাকাত সালাত আদায় করতে বলা হত।
৩. আব্দুল আযীয ইবন রাফী থেকে বর্ণিত। তিনি এক লোকের সূত্রে রাসূল সা. থেকে বর্ণনা করেন যে, তোমারা যখন ইমাম রুকুতে রত অবস্থায় মসজিদে আসবে তখন রুকু করবে। আর যদি সিজদা রত থাকে তখন সিজদা করবে। আর সিজদাটি গণ্য করবে না; যদি তার সাথে রুকু না থাকে।[বায়হাকী, খ.২, পৃ.১২৮, হা:২৫৭৬; নাসির উদ্দিন আলবানী এরওয়া উল গালীলে (২/২১৭) বলেন, এ হাদীসটি বায়হাকী বর্ণনা করেছেন। এটি একটি শক্তিশালী প্রমাণ। কারণ তার সকল রাবী নির্ভরযোগ্য।]
এ হাদীসে দেখা যায় যে সিজদার সাথে রুকু পাওয়া গেলে সে রাকাতটি হয়ে যায়।
৪. যাইদ ইবন ওয়াহাব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদের বাড়ি থেকে তার সাথে মাসজিদের উদ্দেশ্যে বের হলাম। যখন আমরা মাসজিদে পৌছলাম তখন ইমাম রুকুতে চলেগেছেন। তখন আব্দুল্লাহ তাকবীর বলে রুকুতে চলেগেলেন। আমিও তার সাথে রুকু করলাম। অবশেষে আমরা কাতারে গিয়ে শামিল হলাম। তারপর লোকেরা রুকু থেকে তাদের মাথা তোললেন। তিনি বলেন, যখন ইমাম সালাত শেষ করলেন তখন আমি দাড়িয়ে গেলাম। কারণ আমি মনে করেছিলাম আমি রুকু পাই নাই। তখন আব্দুল্লাহ আমার হাত ধরে আমাকে বসিয়ে দিলেন। আর বললেন, তুমি অবশ্যই রাকাত পেয়েছ।’[ ইবন আবু শায়বা, খ.১, পৃ.৯৯; ত্বাহাবী, খ.১, পৃ.২৩১-২৩২; তাবারানী, খ.৩, পৃ.৩২; বায়হাকী, খ.২, পৃ.৯০-৯১; নাসির উদ্দিন আলবানী হাদীসটি সাহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। দেখুন, এরওয়া উল গালীল, খ.২, পৃ,২৬০]
এ ধরণের আরো কয়েকটি হাদীস আছে। আমি মনে করি সত্য গ্রহণ করার মানসিকতা যাদের আছে তাদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

@প্রফেসর মাহফুজুর রহমান
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি,কুষ্টিয়া

No comments

Theme images by PLAINVIEW. Powered by Blogger.