সিরিয়া যুদ্ধ, তুরস্কের সাফল্য ও ব্যর্থতার খতিয়ান

শুরু থেকেই তুরস্ক সিরিয়া ইস্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। বিপ্লবের প্রথম দিকেই তারা আসাদকে গণদাবী মেনে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। বিপ্লবীদের সাথে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় আসার ক্ষেত্রে তারা উভয় পক্ষকে যথাসম্ভব সাহায্য করার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু আসাদ তুরস্কের পরামর্শে কান না দিয়ে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে। ফল যা হবার তা-ই হল। সাত লক্ষ সিরিয় নারী শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়। হাজার বছরের ঐতিহ্যের লীলাভূমি, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়ী একটি রাষ্ট্রকে প্রস্তরযুগে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তারপরও তুরস্ক বারবার চেষ্টা করেছিল উভয় পক্ষকে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় নিয়ে আসতে। কিন্তু আসাদের গোঁড়ামির কাছে তাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। শান্তিপূর্ণভাবে সংকট সমাধানের সব পথ বন্ধ হওয়ার পর তারা সিরিয়ান বিপ্লবীদেরকে সামরিক সাহায্য দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইস্তাম্বুলে ফ্রি সিরিয়ান আর্মির অফিস খোলা হয়। তুরস্কের সহায়তায় একটি প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়। তুরস্কের সীমান্ত শহরগুলোতে গোপনে বিপ্লবীদের সামরিক ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। তুরস্কের এইসব পদক্ষেপ সিরিয়া যুদ্ধের মোড় দ্রুত ঘুরিয়ে দেয়। একের পর এক বড় বড় শহর বিপ্লবীদের দখলে আসতে থাকে। আসাদের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসে। বিপ্লবীরা খুব দ্রুত দামেস্কের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। দামেস্কের ‘গোথা’ শহর বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আসে। তাদের কামানের গোলা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের দেয়ালে এসে আঘাত হানছিল। আসাদের পতন হয়ে দাঁড়িয়েছিল সময়ের ব্যাপার।
কিন্তু তা আর হয়নি। আইএসের আকস্মিক উত্থান সব সম্ভাবনাকে মাটি করে দেয়। আমেরিকা সুর পাল্টায়। তাদের দাবী- আগে আইএস ঠেকাও। এখন আসাদের পতন ঘটানো যাবেনা। কারণ কেন্দ্রীয় সরকার ধ্বংস হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আমরা আরেকটি লিবিয়া চাই না। এভাবে চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও বিপ্লবীরা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। সরকারী বাহিনী আর আইএস যোদ্ধাদের মাঝখানে তাদেরকে দাঁড় করে দেয়া হয়। তাদের নিশ্চিত বিজয়কে ব্ল্যাকমেইল করে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়। তারপর সন্ত্রাস দমনের নামে রাশিয়ার সরাসরি আগ্রাসন সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেয়। সরকারী বাহিনী, হিজবুল্লাহসহ ইরানী শিয়া মিলিশিয়াগ্রুপ, রাশিয়া এবং আইএস- এই চার শক্তির সামনে বিদ্রোহীদের টিকে থাকার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। ধীরে ধীরে তারা তাদের প্রভাব হারাতে থাকে। বিজিত শহরগুলো একে একে হাতছাড়া হতে থাকে। সর্বশেষ হালাবের পতন সিরিয়া বিপ্লবের চূড়ান্ত ভাগ্য লিখে দেয়।
কার্যত তুরস্ক বিপ্লবীদেরকে চূড়ান্ত বিজয় এনে দিতে অক্ষম হয়। তুরস্কের কূটনীতি চরমভাবে মার খায়। এর কারণ তুরস্কের কোন অপরিণামদর্শী ভুল অথবা তাদের কূটনৈতিক অক্ষমতা নয়। বরং দুনিয়ার যেসব পরাশক্তি সিরিয়া সংকটের সহজ সমাধান চায়নি, যারা সাইক্স-পিকট চুক্তির পোস্টমর্টেম করে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে আরেকবার কাটাকুটি করতে চায়, সিরিয়া, তুরস্ক এবং ইরাককে ভেঙ্গে নতুন শিয়া এবং কুর্দি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়ে চিরস্থায়ী আত্মকলহের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চায়, ইসরাইলের ভবিষ্যতকে আরও নিষ্কণ্টক করতে চায়- তাদের সম্মিলিত চক্রান্তের সামনে তুর্কি কূটনীতি ব্যর্থ হয়। তুরস্ককে ব্যর্থ করার জন্য তারা বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে-
(১) তুর্কি সরকার এবং কুর্দি বিদ্রোহী গ্রুপ ‘পিকেকে’র মধ্যে চলতে থাকা শান্তি আলোচনা নস্যাৎ করে দেয়। তাদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্রের লোভ দেখিয়ে তুর্কি সরকারের বিরুদ্ধে আবারও অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য করে। তাদের মুহুর্মুহু বোমা হামলায় ইস্তাম্বুল-আঙ্কারা কেঁপে উঠে। তুরস্কের অর্থনীতি চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আবার তুর্কি-সিরিয়া সীমান্ত বরাবর হাসকা, কুবানি, মিনবিজ, বাব এবং ইফরীন নিয়ে দীর্ঘ করিডোর তৈরি করে সেখানে কুর্দিদের প্রতিষ্ঠা করার চক্রান্ত করে। উদ্দেশ্য তুরস্ককে ভৌগলিকভাবে সিরিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করা। পরবর্তীতে এখানে তুরস্কের কুর্দি এলাকা নিয়ে ‘স্বাধীন কুর্দিরাষ্ট্র’ তৈরি করে তুরস্ককে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়া।
(২) আইএসের উত্থান ছিল সিরিয়া বিপ্লবের পিঠে ছুরিকাঘাতের মতো। তারা আইএসকে ব্যবহার করে বিপ্লবকে চূড়ান্তভাবে ব্ল্যাকমেইল করতে সক্ষম হয়। সিরিয়াবাসির মুক্তির লড়াইকে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের রূপ দেয়া হয়। তুর্কি সমর্থিত বিপ্লবীদেরকে তাদের মিশন থেকে লক্ষ্যচ্যুত করে আইএসের বিরুদ্ধে দাঁড় করে দিয়ে আসাদের অবস্থানকে মজবুত করে দেয়া হয়। উল্টো তুরস্ককে আইএসের সহযোগী হিসেবে প্রচার করে অপরাধীর আসনে বসানোর চেষ্টা করা হয়।
(৩) ইরান ও তার শিয়া সন্ত্রাসীগ্রুপগুলোকে সিরিয়ায় অবাধভাবে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়। তারা এক্ষেত্রে সতীনের পুত্র দিয়ে সাপ মারার পলিসি গ্রহণ করে। উদ্দেশ্য তুর্কি সমর্থিত বিপ্লবীদেরকে ধরাশায়ী করা এবং সিরিয়া থেকে তুর্কি প্রভাবকে চিরতরে খতম করা।
(৪) তারা সৌদিসহ আরব রাষ্ট্রগুলোকে তুরস্ক থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়। একমাত্র কাতার ছাড়া আর কোন আরব রাষ্ট্র তুরস্কের সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। আরব মিডিয়াগুলোতে নব্য উসমানীদের নিয়ে জোরেশোরে প্রচারণা চলতে থাকে। উসমানীদের বিরুদ্ধে মক্কার শরীফ হুসাইনের ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ কাহিনীকে আবারও সামনে নিয়ে আসা হয়। এরদোগানকে "নতুন উসমানী সুলতান" আখ্যা দিয়ে আরবের স্বাধীনতার জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। সিরিয়ায় তুর্কি ত্রানবহরে রাশিয়ার বিমান হামলার খবর এবং ভিডিও ফলাও করে প্রচার করা হয় আর এই জন্য চরম খুশী প্রকাশ করা হয়। যে আরবলীগ সিরিয়ায় রাশিয়ান এবং ইরানী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে টু শব্দও করেনি তারাই সিরিয়া আর ইরাকে তুরস্কের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানায়।
(৫) রাশিয়া আর তুরস্কের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া। তুরস্ক যদিও রুশ আগ্রাসনের কড়া সমালোচনা করেছে কিন্তু সরাসরি রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়ানোর মতো বোকামি করার পক্ষে তারা নয়। কিন্তু চক্রান্তকারীরা এই দিকটিও বাকী রাখেনি। তারা তুর্কি সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা গুলেনপন্থীদের ব্যবহার করে রুশ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। এবং সাথে সাথেই ন্যাটো তুরস্কের ইঞ্জেরলিক বিমান ঘাঁটি থেকে তাদের বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে ফেলে রাশিয়াকে এই ম্যাসেজ দেয় যে, রুশ-তুর্কি সংঘাতে তারা নিরপেক্ষ থাকবে। ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে তারা তুরস্কের পাশে থাকবেনা। উদ্দেশ্য আরেকটি রুশ-তুর্কি যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে এক ঢিলে দুই পাখী শিকার করা।
তুরস্ক পড়ে মহামুসিবতে। এক দিকে তার প্রকাশ্য শত্রু রাশিয়া-ইরান। অন্যদিকে মিত্ররূপি ভয়ংকর শত্রু ধুরন্ধর পশ্চিমা শক্তি। দুই পক্ষের বিরুদ্ধে এককভাবে লড়াই করা মানে নিশ্চিত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া। নিশ্চিতভাবেই কোন এক পক্ষকে বেছে নিতে হবে। গোপন শত্রু থেকে প্রকাশ্য শত্রু অনেক শ্রেয়। তাই তারা রাশিয়ার সাথে বিরোধ মিটিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। বিমান দুর্ঘটনার জন্য তুরস্ক দুঃখ প্রকাশ করে। পুতিনও আর হম্বিতম্বি না করে এরদোগানের হাতে হাত মেলায়।
রাশিয়ার সাথে তুরস্কের সমঝোতায় মুসলিম বিশ্ব হতাশ হলেও এ ছাড়া তাদের হাতে আর কোন বিকল্প ছিল না। আমেরিকা সিরিয়া সংকটকে এতো গভীর করে তুলেছে যে, তা তাদের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। আমেরিকা কোনোভাবেই সিরিয়া সংকটের দ্রুত সমাধান চায় না। তাদের উদ্দেশ্য হল সংকটকে জিইয়ে রেখে রুশ-তুর্কি দুই পক্ষকেই ধংস করা। আমেরিকার এই খেলা বুঝতে তুরস্কের একটুও বেগ পেতে হয়নি। তুরস্ক বুঝতে পারে যে, যেভাবেই হোক সিরিয়া সংকটের দ্রুত সমাধান বের করতে হবে। যুদ্ধের দ্রুত অবসান ঘটাতে হবে। তা না হলে কেবল সিরিয়া নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্য ধংস হয়ে যাবে। তখন থেকেই তুরস্ক তাদের পলিসিতে মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তারা সরাসরি সামরিক সংঘাতের পথ পরিহার করে কূটনৈতিকভাবে সংকট সমাধান করার উদ্যোগ নেয়। রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা ছাড়া যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এভাবেই তুরস্ক নতুন করে যুদ্ধে নামে। তবে এই যুদ্ধ গোলা বারুদের নয়। কূটনৈতিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তারা আশাতীত সফলতা লাভ করে। এর মাধ্যমে তারা সিরিয়া সংকটের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়। জটিল একটি পরিস্থিতিকে সমাধানের কাছাকাছি নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
বিষয়টি বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয়ের উপর নজর দেওয়া যেতে পারে-
#এক
সিরিয়া যুদ্ধে তুরস্কের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ হচ্ছে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা। এর কারণ হচ্ছে কাগজে-কলমে এই পক্ষটি তুরস্কের মিত্র। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারাই তুরস্কের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু। এর কারণ হচ্ছে, রাশিয়া ও ইরান যদিও তুরস্কের শত্রু , কিন্তু তাদের শত্রুতার ক্ষেত্র হছে সিরিয়া ও ইরাক। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে- ইরাক সিরিয়াকে তুরস্কের প্রভাবমুক্ত করা। তুরস্কের আভ্যন্তরীণ ইস্যু নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথা নেই। এরদোগান সরকারের জন্যও তারা হুমকি নয়। কিন্তু পশ্চিমাদের টার্গেট ভিন্ন। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো। এই জন্য তুরস্ক এবং সৌদিআরবকে ধ্বংস করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। এরদোগানের নেতৃত্বে তুরস্ক যে ধীরে ধীরে পশ্চিমা বলয়ের বাইরে চলে যাচ্ছে এটাই তাদের বড় সমস্যা। তারা তুরস্ককে রুশ সিমান্তে তাদের রক্ষী হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। তুরস্কের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করার উদ্যোগ পশ্চিমারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেনা। পাশাপাশি এরদোগান সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় তুরস্কে ইসলামী জাতীয়তাবাদের উত্থান ইসরাইল এবং পশ্চিমা বিশ্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে তারা দু’টি পদক্ষেপ গ্রহণ করেঃ
(১) যেকোনো মূল্যে এরদোগান সরকারের পতন ঘটানো। প্রথমে তারা ২০১৩ সালে ‘গিজী পার্কের’ আন্দোলনকে ব্যবহার করে এরদোগানের পতন ঘটাতে চেয়েছিল। কিন্তু সেখানে তারা ব্যর্থ হয়। এরপর সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৫ই জুলাই সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরদোগানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়। কিন্তু এবারও তারা ব্যর্থ হয়। কিন্তু এতো সহজে তারা হাল ছাড়বে বলে মনে হয়না। এখনও পর্যন্ত তারা তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
(২) প্রয়োজনে গোটা তুরস্ককেই ভেঙ্গে ফেলা। দক্ষিণপূর্ব তুরস্কের বিশাল এলাকা এবং উত্তর সিরিয়া নিয়ে কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই জন্য তারা তুরস্কের বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দি সংগঠন PKK কে তুর্কি সরকারের সাথে শান্তি চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য করে। পাশাপাশি সিরিয়ার কুর্দি বিদ্রোহীগ্রুপগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে মার্কিন কমান্ডোদের দিয়ে তাদের উন্নততর সামরিক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করে। সর্বাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহ করে এইসব সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে শক্তিশালী নিয়মিত সেনাবাহিনীতে রূপান্তর করে। বাহ্যিকভাবে আইএসের কথা বলা হলেও আসল টার্গেট যে তুরস্ক তা বুঝতে তুর্কি সরকারের মোটেও সময় লাগেনি।
আমেরিকা-ইসরাইলের এইসব তৎপরতার ফলে তুরস্কের অস্তিত্বই চরম হুমকির মুখে পড়ে। সিরিয়া নয়, নিজেদের ঘর বাঁচাতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়। পশ্চিমাদের এই প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করা তুরস্কের জন্য অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এর কারণ হচ্ছে- কুর্দিরাষ্ট্র ঠেকানোর একমাত্র পথ হচ্ছে সিরিয়ায় তুরস্কের সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা করা। কিন্তু যুদ্ধবিমান নিয়ে রাশিয়ার সাথে বিরোধের কারণে তারা সিরিয়ায় কদমও ফেলতে পারছেনা। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিলো। বহিঃশত্রুর চক্রান্ত এবং আভ্যন্তরীণ জনমতের চাপের মুখে এরদোগান সরকারের দিশেহারা অবস্থা হয়। সবকিছু বিবেচনা করে এরদোগান সিরিয়া-নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন নিয়ে আসলেন। যুদ্ধবিমান ইস্যুতে রাশিয়ার কাছে দুঃখ প্রকাশ করার মাধ্যমে রুশ-তুর্কি ঝামেলা মিটিয়ে ফেলেন। পশ্চিমাদেরকে কিছুটা খুশী করার জন্য ইসরাইলের সাথে বিরোধের একটা সম্মানজনক সমাধান বের করলেন। তারপর মার্কিন হুমকিকে তোয়াক্কা না করে সরাসরি সিরিয়ায় সৈন্য প্রেরণ করেন। তুরস্কের এই সাহসী সিদ্ধান্তে পশ্চিমারা হকচকিয়ে উঠে। তাদের কুর্দিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চরমভাবে বাধাগ্রস্থ হয়।
তুরস্কের এই পরিবর্তিত কূটনীতির সফলতা এখানেই সীমিত নয়। তুরস্কের লক্ষ্য হচ্ছে যেকোনো মূল্যে যুদ্ধের দ্রুত অবসান ঘটানো। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার মাধ্যমে সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। পরবর্তীতে সব পক্ষের সম্মতিতে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে পাঁচবছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান বের করা। এখানেও মূল বাধা পশ্চিমা বিশ্ব। তাদের লক্ষ্য যুদ্ধকে যতোটুকু সম্ভব দীর্ঘ করা। এই জন্য তারা পাঁচবছর ধরে সিরিয়ায় কোন পক্ষকে চূড়ান্তভাবে জয়ী হতে দিচ্ছেনা। কোন পক্ষ একটু সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেলে অন্য পক্ষকে সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি আবারও পাল্টে দেয়। পশ্চিমাদের এই ইঁদুর-বিড়াল খেলা এখন পুরো দুনিয়ার সামনে স্পষ্ট। তুরস্ক বুঝতে পারে যে, পশ্চিমারা সংকটের অংশ, সমাধানের নয়। সিরিয়ার রক্তবন্যা রোধ করার চাবি মূলত রাশিয়ার হাতে। একটু দেরীতে হলেও তুরস্ক সিরিয়া সংকটকে সঠিকভাবে পড়তে সক্ষম হয়। এখন তুরস্কের লক্ষ্য হচ্ছে সিরিয়া সংকটের লাগাম পশ্চিমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়া। রাশিয়াকে সাথে নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করা। তুরস্ক এখানে আশাতীতভাবে সফল হয়। তুরস্কের তত্ত্বাবধানে ডিসেম্বরের শেষের দিকে আঙ্কারায় রাশিয়া এবং বিপ্লবীদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষ তাদের মতবিরোধকে অনেকটা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়। এর ফলশ্রুতিতে হালাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং দুই লক্ষ হালাববাসী নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়। আঙ্কারার আলোচনার সফলতা তুরস্ককে আরও আশাবাদী করে তোলে। তারা পর্যায়ক্রমে গোটা সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জন্য মস্কোর সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখে। তুরস্কের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে ২০শে ডিসেম্বর মস্কোতে সিরিয়া সংকটের সবচেয়ে কার্যকর তিনটি পক্ষ- তুরস্ক, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার কৌশল ও মূলনীতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা হয়। বৈঠক শেষে গোটা সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ঘোষণাসম্বলিত ‘মস্কো ঘোষণা’ পাঠ করা হয়। ঘোষণা অনুযায়ী একমাস পর্যন্ত গোটা সিরিয়ায় যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। সরকার এবং বিপ্লবীরা কেউ কারও অবস্থানে হামলা করবেনা। এই পরিস্থিতি একমাস পর্যন্ত বহাল থাকবে। জানুয়ারির শেষের দিকে এই তিন দেশের তত্ত্বাবধানে কাজাখিস্তানের রাজধানী আস্তানায় দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
যুদ্ধবিরতি শেষপর্যন্ত টিকে থাকে কি-না, এবং আস্তানা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় কি-না তা সময়ই বলে দেবে। তবে, যতোটুকু অর্জিত হয়েছে তা কূটনৈতিক মু’জিযার চেয়ে কম নয়। দীর্ঘ পাঁচবছর ধরে যে সংকটের কেউ কূলকিনারা করতে পারেনি বা করতে চায়নি তুরস্ক সেই সংকটকে সমাধানের কাছাকাছি নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। তুরস্কের এই পদক্ষেপকে এই জন্যই খুব গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে যে, এর মাধ্যমে তুরস্ক সিরিয়া সংকটের লাগাম পশ্চিমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। ‘মস্কো বৈঠক’ পশ্চিমাদেরকে চরমভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়। ‘আস্তানা বৈঠকে’ পশ্চিমাদেরকে অংশগ্রহণ করতে আহবান করা হয় ঠিকই, কিন্তু এই আহবান যে কেবল কূটনৈতিক নিয়মরক্ষার তা পশ্চিমাদের না বোঝার কথা নয়। এই উদ্যোগ যদি সফল হয় তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা প্রভাব মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে। তুরস্ক, রাশিয়া ও ইরান, এই তিন শক্তিই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কর্ণধার হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে পশ্চিমারা নড়েচড়ে বসে। যুদ্ধবিরতি এবং আস্তানা সম্মেলন বানচাল করা তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। সে অনুযায়ী কর্মপন্থাও নির্ধারণ করা হয়। বিদ্রোহীদেরকে বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে বিল উত্থাপন করা হয়। তুরস্কে রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতকে হত্যা করা হয়। তুর্কি শহরগুলোতে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে। উপযপুরি সন্ত্রাসী হামলা তুরস্কে যেকোনো সময় প্রচণ্ড জনরোষ উস্কে দিতে পারে এবং তা সরকার পতনের আন্দোলনেও রূপ নিতে পারে। ওদিকে রাশিয়া মার্কিন নির্বাচন প্রভাবিত করেছে এমন অভিযোগ তোলে ৩০ জন রাশিয়ান কূটনীতিককে আমেরিকা থেকে বহিস্কার করা হয়। রাশিয়াকে উদ্দেশ্যকরে পোল্যান্ডসহ পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু দেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়। ক্রিমিয়া ইস্যু নিয়ে নতুনভাবে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়। পারমানবিক চুক্তি বাতিল করার হুমকি দিয়ে ইরানকে ভয় দেখানো হয়। আর এখন রাশিয়ার ভয় দেখিয়ে তাদেরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করতে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে।
সন্দেহ নেই, পশ্চিমাদের হাত অনেক লম্বা। এতো সহজে তারা পরাজয় মেনে নিবেনা। পরিস্থিতির মোড় ঘোরানোর জন্য তারা সম্ভাব্য সবকিছুই করবে। তাদের এই চতুর্মুখী আক্রমনের সামনে তুরস্ক টিকে থাকতে পারে কি-না তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু তুরস্ক মৌচাকে আগুন ধরাতে সক্ষম হয়েছে- এটাই তাদের বড় সফলতা। আপাতত তুরস্ক আমেরিকাকে পাল্টা চাপে রাখার জন্য দুটি কৌশল হাতে নেয়। (১) তুরস্কের ইঞ্জিরলিক বিমানঘাঁটি ন্যাটোকে আর ব্যবহার করতে দিবে কি-না এই বিষয়টি পূণরায় খতিয়ে দেখার ঘোষণা দেয়। (২) তুরস্কের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানসহ সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আমেরিকাকে অভিযুক্ত করে তুর্কি মিডিয়ায় জোরালো প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এই দুইটি পদেক্ষেপ খুব কাজ দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সর্বশেষ বিবৃতিগুলোতে তুরস্ককে খুশী করার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
#দুই
রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবে তুরস্কের শত্রু। সময়ের প্রয়োজনে দুই দেশ একে অপরের কাছাকাছি এসেছে ঠিকই কিন্তু কেউ কাউকে মিত্র রূপে গ্রহণ করতে পারেনি। মধ্যেশিয়া এবং পূর্বইউরোপের দখল নিয়ে ১৭ টি বৃহৎ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশের সম্পর্কের যে গভীর ক্ষত তা সহজে মিলিয়ে যাবেনা। কিন্তু প্রথম মহাযুদ্ধের পর থেকে দুই দেশ অনেকটা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে, সিরিয়ায় সরাসরি রুশ আগ্রাসন পরিস্থিতি আবারও ঘোলাটে করে তোলে। সর্বশেষ রুশ যুদ্ধবিমান ধ্বংসের ঘটনা দুই দেশকে আবারও মুখোমুখী দাঁড় করে দেয়। সিরিয়ায় রুশ আগ্রাসনের কারণে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয় তুরস্ক। কারণ, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারণে তুরস্ক সিরিয়ান বিদ্রোহীদেরকে রাশিয়ার বিমান হামলা মোকাবেলা করার জন্য বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে সিরিয়া যুদ্ধের মোড় দ্রুত ঘুরে যায়। সরকারী বাহিনী একের পর এক হারানো এলাকা পুনরুদ্ধার করতে থাকে। পরিস্থিতির পরিবর্তন আনার জন্য তুরস্ক জাতিসঙ্ঘও ও পশ্চিমাদের কাছে অনেক তদবির করেছে। কিন্তু তাদের সব প্রচেষ্টাতেই পশ্চিমারা নাটকীয়ভাবে ভেটো দেয়। ধীরে ধীরে তুরস্কের সামনে ষড়যন্ত্রের সূত্রগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। তারা বুঝতে পারে যে যুদ্ধের অর্ধেক পথে মিত্ররা তাদেরকে একা রেখে কৌশলে সরে পড়েছে। তিনটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের (রাশিয়া, ইরান ও আসাদ) বিরুদ্ধে তুরস্ক সম্পূর্ণ একা। এই অবস্থায় পেছনে আসারও সুযোগ নাই। আবার আগের নীতিতে অটল থাকার অর্থ হবে নিশ্চিতভাবে আগুনে আত্মাহুতি দেয়া। সব কূল হারানো। তুরস্ক তার নীতি পাল্টায়। শত্রুতার পরিবর্তে মিত্রতা দিয়েই রাশিয়াকে ঘায়েল করার নীতি গ্রহণ করে। রাশিয়ার দুর্বলতাগুলোকে খুঁজে বের করে সেগুলোকে কাজে লাগায়। রাশিয়ার অর্থনৈতিক সংকটের কথা মাথায় রেখে তাদেরকে গ্যাসলাইন স্থাপনসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক টোপ দেয়। সিরিয়ায় রাশিয়ার অস্তিত্বকে আপাতত মেনে নেয়। এর মাধ্যমে তুরস্ক কুকুর দিয়ে শিয়াল তাড়ানোর নীতি গ্রহণ করে। তুরস্কের এই প্র্যাগম্যাটিক কূটনীতির সফলতা বুঝার জন্য রুশ রাষ্ট্রদূত হত্যার ঘটনাটিই যথেষ্ট। একটা বিমান ধ্বংসের ঘটনায় রাশিয়া কী-না করেছিল, কিন্তু এবার রাষ্ট্রদূত হত্যার মতো এতো বড়ো ঘটনাকেও রগচটা পুতিন নীরবে হজম করতে বাধ্য হয়।
#তিন
তুরস্কের আরেকটি কূটনৈতিক সফলতা হচ্ছে ইরানকে কোণঠাসা করা। মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ইরান। ইরানও তুরস্ককে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে। সামরিক দিক দিয়ে তুরস্ক ইরানের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। তুরস্কের সামরিকবাহিনী বিশ্বের শক্তিশালী ও আধুনিক সেনাবাহিনীগুলোর একটি। প্রত্যেকটি সামরিক র্যা ঙ্কিংয়ে তুরস্ককে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম স্থানে রাখা হয়। এমনকি ইসরাইলেরও উপরে। অবশ্য পারমানবিক সক্ষমতাকে এখানে ধরা হয়না। যদি তুরস্ক আর ইরানের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক যুদ্ধ হয় তাহলে ইরান সহজেই ধরাশায়ী হবে। কেবল ইরানের নৌশক্তিই তুরস্কের কিছুটা মাথাব্যথার কারণ হবে। তবে তা-ও তেমন হুমকি হবেনা। কারণ সুয়েজ পার হয়ে ইরানী যুদ্ধজাহাজ কোনোভাবেই ভুমধ্যসাগরে প্রবেশ করতে পারবেনা। আর ইরানের বিমান শক্তি হচ্ছে পুরাই মান্ধাতা আমলের। রাশিয়ার মিগ-২৯ ই তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তুরস্কের এফ-১৬ এবং টাইফুনের সামনে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সহজেই ভেঙ্গে পড়বে। ইরানের পদাতিকবাহিনীর অবস্থাও তেমন ভালো নয়। ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরানের পদাতিকবাহিনী চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল। এখনও তাদের অবস্থার তেমন বেশী পরিবর্তন হয়নি। ইরানের সেনাবাহিনীর যে হাঁকডাক শুনা যায় তার পুরাটাই মিডিয়াসর্বস্ব। আসলে তারা কাগুজে বাঘ ছাড়া কিছু নয়। তাদের অবস্থা হচ্ছে ষাটের দশকের জামাল আব্দুন নাসেরের মিসরের মতো। নাসেরও তখন নিজেকে বিশ্বনেতা হিসেবে জাহির করতো। কিন্তু ৬৭ এর জুনে মাত্র ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইল মিসর, জর্ডান ও সিরিয়াকে তুলোধুনো করে ছাড়ে। নাসেরের আসল চেহারা দুনিয়ার সামনে স্পষ্ট হয়।
কিন্তু তুরস্ক আর ইরানের মধ্যে এই ধরণের যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বরং দুই দেশ প্রক্সি যুদ্ধে জড়াবে। জড়িয়েছেও। এই দিকটায় ইরান তুরস্কের চেয়ে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে। এর কারণ হচ্ছে দু’টি-
(১) ইরান অনেক দিন ধরে ইরাক, সিরিয়া এবং লেবাননের শিয়া মিলিশিয়াগ্রুপগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়ে আসছে। এখন সেগুলোকে তারা ব্যবহারও করছে। বিপরীতে তুরস্ক এমন কোন ধর্মীয় সন্ত্রাসীগ্রুপ গড়ে তোলেনি।
(২) ইরাক এবং সিরিয়ায় শিয়া সরকার ক্ষমতায়। ইরান এই দুই দেশে ঢুকেছে আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী বৈধ সরকারের অনুমতি নিয়ে। তাই তাদের নিরাপত্তাপরিষদের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখী হওয়ার ভয় নেই। কিন্তু এই সুবিধা থেকে তুরস্ক সম্পূর্ণ বঞ্চিত। ইরাকের বা’শীকা এবং উত্তর সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি থাকলেও তাদেরকে দখলদার হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কারণ তারা ওইসব দেশের অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করেনি। এই দুটি পয়েন্টে তুরস্কের অবস্থান অনেকটা দুর্বল। তাই তারা ইরানকে মোকাবেলা করার জন্য এখানে রাশিয়াকে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয়। এমনিতেই রুশ-ইরান দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী ছিল। তুরস্ক কৌশলে এই বিরোধকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার প্রয়াস চালায়। হালাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং তার পরের ঘটনাগুলোতে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। সর্বশেষ ‘মস্কো বৈঠকে’ ইরানকে ডাকা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আসল তাস ছিল তুরস্ক আর রাশিয়ার হাতে। ইরান সেখানে দর্শকের ভূমিকা পালন করে মাত্র। ইরানও বিষয়টা ধরতে পারে। ইরানী মিডিয়া এ নিয়ে চরম হৈচৈ ফেলে দেয়। আর তাই তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করার জন্য আসাদকে চাপ দেয়। ইদলিব এবং পূর্বদামেস্কে সরকারী বাহিনী আবারও বিদ্রোহী অবস্থানের উপর গোলাবর্ষণ শুরু করে। তুর্কি-রুশ প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার জন্য পশ্চিমারাও পর্দার আড়াল থেকে কলকাটি নাড়ে। কিন্তু রাশিয়া আর তুরস্কের চাপের কারণে ইরান আবারও সোজা পথে আসতে শুরু করেছে। এভাবেই তুরস্ক সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে কূটনৈতিকভাবে রাশিয়াকে ব্যবহার করে ইরানকে মোকাবেলা করছে। এটাকে তুরস্কের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তুরস্ক সিরিয়ায় এবং ইরাকে শতভাগ সফল হয়েছে তা হয়তো বলা যাবেনা। কিন্তু তুরস্কের শত্রুর দীর্ঘ তালিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে তাকালে তুরস্কের অর্জনকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে। পশ্চিমা দুনিয়ায় এরদোগান নন্দিত ব্যক্তি নন, কিন্তু তাঁর সাহস, কারিশমা, দূরদর্শিতা ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের আশ্চর্য ক্ষমতা তাদেরও সমীহ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
আমরা মুসলমানরা জাতি হিসেবে চরম আবেগি। আমরা কাউকে খুব সহজেই হিরো বানিয়ে ফেলি। আবার পান থেকে চুন খসলেই তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে কার্পণ্য করিনা। পরিস্থিতি বোঝার কোন চেষ্টাই বলতে গেলে আমাদের থাকেনা। বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি আগের যুগের খেলাফত আমলের মতো নয়, যেখানে শত্রু-মিত্র চিনতে বেগ পেতে হতোনা। কিন্তু এখন আপনার চরম শত্রুটিও কাগজে-কলমে আপনার ঘনিষ্ঠ মিত্র। আপনি চাইলেই হুটকরে তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে পারবেন না। তার জন্য উপযুক্ত সময়, সুযোগ এবং নিখুঁত পরিকল্পনার প্রয়োজন। আবার আপনার চরম শত্রুটিও আপনার কাজে আসতে পারে। বর্তমানে শত্রু –মিত্রের স্থায়ী কোন দেয়াল নেই। স্বার্থই এখন বিশ্বরাজনীতির নিয়ামক শক্তি। এখানে ‘মৈত্রী’ এক ধরণের শেকলের মতো। ক্ষেত্র বিশেষে মৈত্রী দিয়ে যা অর্জন করা যায় তা শত্রুতা দিয়ে অর্জন করা যায় না। এই বিষয়গুলো আমাদের বুঝতে হবে। আবেগ দিয়ে কোন ঘটনাকে মূল্যায়ন করার যৌক্তিকতা আগেও ছিল না, এখনও নেই। হুদাইবিয়ার সন্ধির যৌক্তিকতা অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম বুঝতে পারেন নি। কিন্তু সেটাই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। রিদ্দার যুদ্ধে হযরত উমর রাজিঃ সহ অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম হযরত আবুবাকার সিদ্দীক রজিঃ এর বিরোধিতা করেছিলেন। পরে সবাই স্বীকার করলেন যে, সেদিন আবুবাকার না থাকলে ইসলামের অস্তিত্বই বিপন্ন হতোউ। উসমানী খলীফা সুলতান আব্দুল হামিদকে স্বৈরাচার আখ্যা দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা গেলো ইহুদিদের হাতে কুদস বিক্রি করতে সম্মত হন নাই বলেই তাঁকে ক্ষমতা হারাতে হয় এবং তাঁর জন্য এখনও কাঁদতে হয়। আমরা জাতি হিসেবে গাদ্দার তৈরি করতে যেমন সিদ্ধহস্ত তেমনিভাবে মুখলিসদেরকে গাদ্দার উপাধি দিতেও আমাদের বেশী সময় লাগেনা।
চোখ কান খোলা রেখে শত্রু –মিত্রের মানদণ্ড নির্ণয় করা উচিত। আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতার আলোকে পরিস্থিতিকে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। উম্মাহর এই চরম দুর্দিনে ‘সবাইকে’ হারানোর মতো বোকামি করা আত্মহত্যা বৈ কিছু নয়।
@মুহাম্মদ নোমান
আল আজহার ইউনিভার্সিটি

No comments

Theme images by PLAINVIEW. Powered by Blogger.